তাঁরা আলাদা দেশের নেতা ও সরকারপ্রধান; এমনকি মহাদেশও ভিন্ন। একজন উত্তর আমেরিকা, একজন মধ্যপ্রাচ্য, একজন এশিয়া এবং আরেকজন ইউরোপের। তাঁদের রাজনৈতিক ‘আদর্শ’ আলাদা, ধর্ম আলাদা, আলাদা তাঁদের অনুসারী গোষ্ঠীও। এত সব ভিন্নতার পরও তাঁদের কথা ও কাজে ‘বিস্ময়কর’ সব মিল পাওয়া যায়!
সমকালীন বিশ্বরাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় পরিচয় এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের উত্থান বেশ লক্ষণীয়। এই ধারারই চারটি উল্লেখযোগ্য মুখ হলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরায়েলের দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান।
নিজ নিজ দেশের পটভূমিতে তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁদের মিল যেখানে সেটা হলো গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং সমানাধিকারের প্রশ্নে তাঁদের অনেক পদক্ষেপ সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই নেতারা একদিকে বিশাল জনসমর্থন পেয়েছেন, অন্যদিকে হুমকি তৈরি করেছেন গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প
ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য এক মৌলিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। একজন সফল ব্যবসায়ী এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া ট্রাম্প রাজনীতিকে এক নতুন ধাঁচে চালনা করেন—যার ফলে তাঁকে অনেক সময় গণতান্ত্রিক রীতিনীতির জন্য হুমকি বলেই বিবেচনা করা হয়। ট্রাম্প রাজনীতির মূলধারার বাইরে থেকে এসে জনরোষ ও অসন্তোষকে পুঁজি করে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসেছেন।
ট্রাম্প আমেরিকার সমাজকে আগের চেয়ে আরও মেরুকৃত করেছেন—বর্ণ, অভিবাসন, লিঙ্গ ও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে। তাঁর কথাবার্তা অনেক সময় বিভাজনকে উসকে দিয়েছে। ট্রাম্প প্রায়ই ডেমোক্র্যাটদের ‘দুশমন’ বা ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ট্রাম্পের বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত ভাষা অনেক সময় তাঁর সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতা ও ঘৃণা উসকে দিয়েছে।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের দীর্ঘতম সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর শাসনব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক মানদণ্ড, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ফিলিস্তিনি প্রশ্ন এবং ঘরোয়া রাজনীতিতে মেরুকরণ ইত্যাদি বিষয়ে গভীর বিতর্ক রয়েছে। নেতানিয়াহুর সরকারের সবচেয়ে বড় সমালোচনা আসে তাঁর সাম্প্রতিক বিচার বিভাগের সংস্কার পরিকল্পনা থেকে, যেটিকে অনেকেই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর আঘাত এবং গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেন। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ঘুষ, প্রতারণা ও আস্থাভঙ্গের অভিযোগে মামলা চলছে; যদিও তিনি নিজেকে ষড়যন্ত্রের শিকার বলেই দাবি করেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে চলমান এই মামলা ইসরায়েলের রাজনৈতিক শুদ্ধাচারের প্রশ্নে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনিদের প্রতি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন। বসতি স্থাপন, গাজায় সামরিক হামলা এবং ‘দুই রাষ্ট্র সমাধান’-এর প্রতি অনীহা তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিসরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করেছে। তাঁর নেতৃত্বে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বহুবার আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছে। তিনি ধর্মীয় দল ও উগ্র ডানপন্থী অংশীদারদের সঙ্গে জোট গঠন করে ইসরায়েলি সমাজে ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মীয় অংশের মধ্যে তীব্র বিভাজন সৃষ্টি করেছেন। আরব-ইসরায়েলিদের অধিকারের প্রশ্নেও তাঁর অবস্থানকে বিভাজনমূলক হিসেবে দেখা হয়।
নরেন্দ্র মোদি
মোদি ২০১৪ সাল থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এর আগে তিনি গুজরাট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন দীর্ঘকাল। মোদির নেতৃত্বে ভারত একদিকে যেমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ডিজিটাল উন্নয়ন ও বৈশ্বিক কূটনীতিতে একটি দৃঢ় অবস্থান লাভ করেছে, অন্যদিকে তাঁর শাসনব্যবস্থাকে ঘিরে উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় বিভাজন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের হ্রাসের অভিযোগও প্রবলভাবে উঠেছে।
মোদি সরকারের সবচেয়ে বড় সমালোচনা হলো, ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের আদর্শ থেকে সরে এসে একটি হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরের চেষ্টা। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ), জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি), বাবরি মসজিদের রায় ও হিজাব ইস্যুতে সরকারের ভূমিকা সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। মোদি সরকার সমালোচনাকারী সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে দমনমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তথ্যের অবাধ প্রবাহ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিরোধী কণ্ঠ রোধ করার ক্ষেত্রে মোদি সরকারের ভূমিকা গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের পরিপন্থী।
রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান
২০০৩ সাল থেকে তুরস্ক শাসন করছেন এরদোয়ান; প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবং ২০১৪ সাল থেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে। তিনি একজন ক্যারিশম্যাটিক, একই সঙ্গে বিতর্কিত নেতা। এরদোয়ান একজন ইসলামপন্থী রাজনীতিক হলেও প্রথম দিকে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে একটি ‘মডারেট’ (মধ্যপন্থী) ইসলামি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
এরদোয়ান শাসনামলে তুরস্ক অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিকভাবে কিছু নতুন কূটনৈতিক স্থান অর্জন করলেও গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে বলে সমালোচনা রয়েছে। তিনি রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করেছেন, বিচার বিভাগকে দলীয় নিয়ন্ত্রণে এনেছেন এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাহী ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছেন।