এবার ঈদের আমেজ নানা কারণেই কিছুটা ভিন্ন। এত লম্বা ঈদের ছুটি আগে কখনো হয়েছিল কি? ঈদ সামনে রেখে জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর যে বেপরোয়া প্রতিযোগিতা দেখা যায়, এবার সেটা ছিল না। যাঁরা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের কোনো সাফল্য দেখেন না, তাঁরা এই বাজারের নিরুত্তাপের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারেন।
ঈদের সরকারি ছুটি এখনো শেষ হয়নি। যাঁরা ঢাকা ছেড়েছেন তাঁদের সবাই এখনো ফিরে আসেননি। আমি নিজেও এখনো গ্রামে আছি। গ্রামগঞ্জের চায়ের দোকানগুলো এখন মুখর জমজমাট আড্ডায়। চায়ের কাপে ঝড় তুলে রাজা-উজির মারতে বাঙালির চেয়ে আর কোনো জাতি এগিয়ে আছে বলে আমার মনে হয় না। শুধু কি চায়ের দোকান? সোশ্যাল মিডিয়ায়ও তো ঝড় উঠেছে। না, এটা কালবৈশাখীর ঝড় নয়, মতামতের ঝড়। নানা আলোচনা জমে উঠেছে। দেশের রাজনীতি যে কথানির্ভর, সেটা তো অস্বীকার করা যাবে না! আমরা কাজে বড় না হয়ে কথায় বড় হতে চাই সবাই। যাহোক, দেশের রাজনীতি যে ঈদের খুশির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে জানে, তা তো আমরা বহুবার দেখেছি। এবারও ব্যতিক্রম নয়।
একটি চায়ের আড্ডায় উপস্থিত থেকে কানে যেসব কথা এসেছে, তারই কিছু পাঠকের সামনে পেশ করার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না।
ঈদযাত্রা নিয়ে একজন বলছেন, ‘আহা! এবার কী নির্বিঘ্ন এক যাত্রা! এমন রাস্তাঘাট তো স্বপ্নেও ভাবিনি।’
আরেকজন চোখ টিপে বলছেন, ‘এবার যানজট হবে কীভাবে? যারা ফ্যাসিবাদের দোসর, তারা তো এখন বাইরে।’
আরেকজন ঠোঁট উল্টে বললেন, ‘আসলে ছুটি লম্বা হওয়ায় চাপ কমেছে। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা তো কমেনি। চালকদের অসতর্কতা, বেপরোয়া প্রতিযোগিতা বুঝি কখনো শেষ হবে না। এ নিয়ে কেউ বলছে না কেন?’
পাশের টেবিল থেকে কেউ একজন যোগ দিলেন, ‘ঈদের নামাজের পর রাজনৈতিক নেতারা এবার খুব ফুরফুরে মেজাজে কোলাকুলি করেছেন, হাতে হাত রেখে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করেছেন। ১৫-১৬ বছর পর মুক্ত পরিবেশে ঈদ করতে পেরেছেন, তাঁদের আনন্দ তো দেখার মতো!’
একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ বললেন, ‘তবে তাঁদের চেয়ে বেশি আনন্দিত তাঁরা, যাঁরা আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে সরকারের অংশ হওয়ার খোয়াব দেখছেন।’
সবাই হেসে উঠলেন।
একজন যেন কিছুটা স্বগতোক্তি করে বললেন, ‘নিরানন্দ ঈদও কিন্তু কেটেছে অনেকের। ফ্যাসিবাদের দোসর ট্যাগ লাগানো মানুষগুলোর তো ঈদটা বিষাদময় হয়ে গেল!’
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আরেকজন বললেন, ‘সময় যে চিরদিন একরকম যায় না, এটা যারা বুঝতে পারে না, বুঝতে চায় না, তাদের তো পাপের ফল ভোগ করতেই হবে।’
হঠাৎ করেই নির্বাচনী আলাপে টার্ন নিল আড্ডা। ‘নির্বাচন হবে কবে?’ কেউ একজন প্রশ্ন করতেই আরেকজন বলে উঠলেন, ‘এটা তো এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন! কিন্তু উত্তর কি কারও জানা? কিছু নেতা ঈদটাকেই প্রচারের প্ল্যাটফর্ম বানিয়ে ফেলেছেন।’
চায়ের দোকানের হাফ প্যান্ট পরা কিশোর ছেলেটা লম্বা টেবিলটায় কয়েক প্লেট গরম শিঙাড়া দিয়ে গেল। সেগুলো মুখে পোরার যেন ছোটখাটো প্রতিযোগিতা হয়ে গেল।
একজন কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘নতুন গঠিত রাজনৈতিক দলের তরুণ সংগঠকদের নির্বাচনী এলাকায় যেভাবে ব্যয়বহুল প্রচারণার খবর পাওয়া যাচ্ছে, কারা এই ব্যয়ের জোগান দিচ্ছেন? এসব কিন্তু নতুন রাজনীতির পরিচয় বহন করছে না।’
একজন মোবাইল ফোন বের করে দেখালেন, জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক সারজিস আলম তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ড. ইউনূসকে পাঁচ বছর সরকারপ্রধান দেখতে চান। আবার দু-এক জায়গায় ঈদের নামাজ শেষে উৎসাহী জনতার পক্ষ থেকে স্লোগান উঠেছে: ড. ইউনূসের সরকার বারবার দরকার!
এসব শুনে এক বৃদ্ধ একটু হেসে বললেন, ‘এগুলো আবার কিসের লক্ষণ? বারবার সরকারপ্রধান থাকার অভিজ্ঞতা কি আমাদের হয়নি?’
পাশ থেকে একজন বলে উঠলেন, ‘ইউনূস সাহেব নিজে তো এমন কিছু বলেননি।’