মোল্লা নাসিরউদ্দিনের গল্প স্রেফ গল্প নয়

www.ajkerpatrika.com বিধান রিবেরু প্রকাশিত: ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ০৯:৩০

আর কিছুদিন পরই পয়লা বৈশাখ। সেদিন মঙ্গল শোভাযাত্রা হবে, না আনন্দ শোভাযাত্রা, তা নিয়ে বিস্তর তর্ক-বিতর্কের পর স্থির হলো মঙ্গলেই সবাই নোঙর ফেলবে। আলাপ শুধু এখানে হলে ভালো হতো, দেখা গেল মঙ্গল শোভাযাত্রায় কোন ধরনের মোটিফ ও পুতুল থাকবে, তা নিয়েও চলল তুমুল তর্ক। বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু মোটিফ নিয়ে আপত্তি তোলা হলো। আগের তুলনা টানা হলো। আবার বলা হলো রাজনৈতিক পুতুল তো থাকতেই পারে। তো এই তুমুল তর্ক-বিতর্কের ভেতর কিছু কাটছাঁট হলো। উদ্বাহু পুতুল বাদ পড়ল। বৈশাখী শোভাযাত্রাসংক্রান্ত বাহাসের ভেতরেই অতিবাহিত হলো পবিত্র ঈদুল ফিতর।


সবাই ঈদের সময় অপূর্ব এক শোভাযাত্রা পর্যবেক্ষণ করল। যেখানে আরব্য রজনীর চেরাগি দৈত্য, আলাদিন, আলিবাবা প্রমুখ চরিত্র এসেছে। বাদ পড়েছে শেহেরজাদি, জেসমিন, মর্জিনাদের মতো নারী চরিত্র। তবে এই শোভাযাত্রায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলেন তুর্কি দেশের কাল্পনিক চরিত্র মোল্লা নাসিরউদ্দিন হোজ্জা। কারণ, লোকজন তাঁর মুখাবয়বে নাকি অন্য হোমরাচোমরাদের মিল খুঁজে পেয়েছে! নাসিরউদ্দিনের প্রসঙ্গ যখন এল, তখন ওনার সর্বজনশ্রুত একটি গল্পের কথা মনে করিয়ে দিই।

একবার নাসিরউদ্দিনকে দেখা গেল, রাতের বেলায় তিনি কী যেন খুঁজছেন রাস্তায়। এক পথচারী এসে জিজ্ঞেস করলেন, কী খুঁজছেন মোল্লা সাহেব? নাসিরউদ্দিন উত্তর দিলেন, চাবি খুঁজছি। পথচারী ভাবলেন মোল্লাকে তিনি একটু সহায়তা করবেন চাবি খোঁজায়। দুজন মিলে অনেক খোঁজাখুঁজি চলছে। তো পথচারী আবার জিজ্ঞেস করলেন, ঠিক কোন জায়গায় পড়েছিল আপনার চাবিটা? মোল্লা এবার গম্ভীর মুখে বললেন, ঘরে। জবাব শুনে পথচারীর মূর্ছা যাওয়ার দশা। তিনি বললেন, ঘরে চাবি হারিয়েছে, তো রাস্তায় এসে খুঁজছেন কেন? মোল্লা উত্তরে বললেন, ভাই, ঘরে আলো নেই, আর রাস্তায় আলো রয়েছে। যেখানে আলো, সেখানেই তো হারানো জিনিস খুঁজব। ঘরে খোঁজার আলো থাকলে ঘরেই খুঁজতাম।

গল্পটি স্রেফ গল্প হলে এটি পুনরায় বলে সময় নষ্ট করতাম না। বর্তমানে যা হচ্ছে বাংলাদেশে, এই গল্পের সঙ্গে প্রচণ্ড রকম সমাপতন ঘটে। আর এমনই তার মাত্রা যে, লোকজন পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার পাল্টা জবাবে ঈদের আনন্দযাত্রাতে নাসিরউদ্দিনকে হাজির করে ফেলেছে। একেই বলে ফ্রয়েডের ‘অচেতন’। নাসিরউদ্দিন যেমন সমস্যা যেখানে, সেখানে না খুঁজে ভিন্ন জায়গায় গিয়ে সমাধান খুঁজছিল, বাংলাদেশেও এই আনন্দ শোভাযাত্রার পৃষ্ঠপোষক ও সমর্থকেরা ভিন্ন জায়গায় সমাধান খুঁজছেন। কারণ, তাঁরা জানেন, আসল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ও শক্তি তাঁদের নেই। সত্যিকারের সমাধানের জন্য যে অন্ধকার দূর করতে হবে, যে হাজার ওয়াটের আলো জ্বালাতে হবে, সেই জ্বালানি বা দূরদর্শিতা তাঁদের নেই।


বাংলাদেশের মানুষ কী চায়? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ এবং পরিচ্ছন্ন ও জবাবদিহিমূলক রাজনীতি। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রথমেই রাখা প্রয়োজন দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে। কারণ, শিক্ষার মাধ্যমেই একটি জাতির ভবিষ্যৎকে অভিন্ন মুখে ধাবিত করা সম্ভব। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কমপক্ষে পাঁচ রকম, ছেলেমেয়েরা ভিন্ন ভিন্ন চিন্তাধারা নিয়ে বড় হয় এখানে। সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ইত্যাদি সম্পর্কিত ধারণা তাদের একেক জনের একেক রকম। কাজেই তারা ভিন্ন ভিন্ন তরিকা নিয়ে যখন বড় হয়, তখন তারা রাষ্ট্রকে ভিন্ন ভিন্ন তরিকায় গড়ে তোলার চেষ্টা করে। আর তাতেই দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। এই দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে চরমে উন্নীত হয় এবং সেটার ছাপ সমাজ থেকে রাষ্ট্র—সর্বত্র প্রকট হয়ে ওঠে। কেউ মনে করে দেশীয় সমাজ ও সংস্কৃতি আগে। কেউ মনে করে ধর্মটা আগে। কেউ মনে করে বিদেশি সংস্কৃতিই সেরা। কেউ কেউ আবার হাইব্রিড! এই তো চলছে দেশে।


এখন যে আলাপটি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, একাত্তর না চব্বিশ, এসব আলাপের গোড়াও কিন্তু সেই একটা জায়গাতেই। ন্যূনতম ইতিহাস জ্ঞান যাঁর আছে, তিনি কখনোই বাংলাদেশের একাত্তর সালের ইতিহাসের সঙ্গে এই ২০২৪-কে তুলনা করবেন না। কিন্তু গোড়ায় গলদ থাকলে যা হয়, সেটাই হচ্ছে। আর তার খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিজড়িত স্থাপনা, জাদুঘর ও স্মৃতি সংরক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে। শাহবাগের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা জাদুঘরে ভাঙচুর, ধানমন্ডি ৩২ শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া, লালমনিরহাটের বিডিআর রোডে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্মারক মঞ্চে স্থাপিত ম্যুরাল ভেঙে ফেলা ইত্যাদি সেসব বোঝাপড়ার গলদের একেকটি উদাহরণমাত্র। তালিকা দিয়ে লেখা ভারাক্রান্ত করতে চাই না। শুধু বলতে চাই, সমাধান আমরা যেখানে খুঁজছি, সমাধান সেখানে নেই।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও