
তামাক ও ধূমপান ডায়াবেটিসের জটিলতা বাড়ায়
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এবারও পালিত হচ্ছে জাতীয় ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবস। দিবসটি পালনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে ডায়াবেটিস রোগের লক্ষণ, চিকিৎস ও নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা। ২০২৫ সালে দিবসটির এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘ডায়াবেটিস : ঝুঁকি জানুন। শনাক্ত করুন। েপদক্ষেপ নিন। প্রতিরোধের এখনই সময়।’
‘ডায়াবেটিস স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য’। ইংরেজিতে বলা হয়েছে ‘ডায়াবেটিস কেয়ার ফর এভরিওয়ান’।
এ কথা অনস্বীকার্য যে ডায়াবেটিসের স্বাস্থ্যসেবা এখন পর্যন্ত এক বিরাট অংশের ডায়াবেটিক রোগীকে নিশ্চিত করা যায়নি। বিশেষত সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় মানুষের জন্য। সুতরাং এই বঞ্চিত অসহায় মানুষের জীবনেও ডায়াবেটিস সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ, যা ব্যক্তি এবং তাদের পরিবার, সেই সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।
ডায়াবেটিস সারা জীবনের রোগ। নিয়ন্ত্রণে থাকলে স্বাভাবিক জীবন যাপন করা যায়, কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের জটিলতা অনেক। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ডায়াবেটিস বৃদ্ধির হার বেশি। উন্নত বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে ডায়াবেটিসকে মৃত্যুর চতুর্থ প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। সুতরাং প্রতিদিন যেমন ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি বাড়ছে ডায়াবেটিক রোগীদের নানা ধরনের জটিলতা।
ডায়াবেটিস এটলাসের তথ্য মতে, ২০২১ সালে ৫৩.৭ কোটি মানুষ (প্রতি ১০ জনে একজন) ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিল। ২০৩০ সালের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৬৪.৩ কোটিতে এবং ২০৪৫ সালে ৭৮.৩ কোটিতে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ২৪ কোটি মানুষ (প্রতি দুইজনে একজন) জানে না তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তাদের বেশির ভাগই টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ১২ লাখেরও বেশি শিশু ও কিশোর (০-১৯ বছর) টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ২০২১ সালে বিশ্বের ৬৭ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসের কারণে মৃত্যুবরণ করে। ২০২১ সালে ৯৬৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় ডায়াবেটিসের কারণে, যা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে মোট ব্যয়ের ৯ শতাংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডায়াবেটিসকে মহামারি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন, তা হচ্ছে দৈনন্দিন জীবনে আমাদের শারীরিক সক্রিয়তা কম এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য গ্রহণ না করা। বংশগত কারণ ছাড়াও নগরায়ণ ও পরিবর্তিত জীবনধারণের কারণেও ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতিবছর ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ৪০০ থেকে ৫০০ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশনের (আইডিএফ) তথ্যানুসারে, বাংলাদেশে ১৭ হাজারের বেশি শিশু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। তাদের মধ্যে ৮২ শতাংশ টাইপ-১ এবং ১৮ শতাংশ টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। সারা বিশ্বে এক লাখ ৩৫ হাজারের বেশি শিশু এই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। বারডেম জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎস নেয় এমন সর্বোচ্চ ১৬ বছরের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা আট হাজারের বেশি! অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম ও শরীরচর্চা না করা, মুটিয়ে যাওয়া ও স্থূলতায় ভুগছে এমন শিশুরা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্তের ঝুঁকিতে আছে। বড় উদ্বেগের বিষয়, আমাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় চার কোটি মানুষ তামাক সেবন ও ধূমপান করে। সুতরাং বিরাট অংশের জনগোষ্ঠী ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে আছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপান টাইপ-২ ডায়াবেটিসের একটি কারণ। প্রকৃতপক্ষে যারা সিগারেটে অভ্যস্ত, তাদের ধূমপান না করা লোকদের তুলনায় টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের যাঁরা ধূমপান করেন, তাঁদের ইনসুলিন ডোজ বা মাত্রা কার্যকর করতে সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা বেশি। একজন ধূমপায়ী যত বেশি ধূমপান করবেন, তাঁর টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তত বেশি। যে ধরনের ডায়াবেটিস থাকুক না কেন, ধূমপান বা তামাক গ্রহণ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা আরো শক্ত করে তোলে। যদি কারো ডায়াবেটিস হয় এবং তিনি যদি ধূমপান করেন, তবে ডায়াবেটিস থেকে তাঁর বিভিন্ন জটিলতা হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। যেমন—হৃদরোগ, কিডনি রোগ এবং পায়ে দুর্বল রক্তপ্রবাহ, যা সংক্রমণ, আলসার এবং সম্ভাব্য পা কেটে ফেলার কারণ হতে পারে (পায়ের আঙুল বা পায়ের অংশ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শরীরের কোনো অংশ কেটে ফেলা)। তা ছাড়া রেটিনোপ্যাথি চোখের রোগ, যা অন্ধত্বের কারণ হতে পারে। পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি হাতে ও পায়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্নায়ু, যা অসাড়তা, ব্যথা, দুর্বলতা সৃষ্টি করে। ধূমপান ছেড়ে দিলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস করতে পারে। টাইপ-২ ডায়াবেটিস বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক দীর্ঘস্থায়ী রোগগুলোর মধ্যে একটি, যা সব ধরনের ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে ৯৫ শতাংশেরও বেশি।
তামাকজাত পণ্যগুলোতে পাওয়া নিকোটিন একটি রাসায়নিক বিষাক্ত পদার্থ, যা রক্তে শর্করাকে বাড়িয়ে তোলে। সিগারেট ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের রাসায়নিক পদার্থ দেহের ক্ষতি করে এবং প্রদাহ সৃষ্টি করে (প্রতিরোধক্ষমতা নষ্ট করে)। দেহের এই প্রদাহ এবং নিকোটিন উভয়ই দেহের রক্তে শর্করাকে নিয়ন্ত্রণপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করে তোলে। যাঁরা ধূমপান করেন, তাঁদের পেটে চর্বি হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বাড়িয়ে তোলে, এমনকি তাঁদের ওজন যদি বেশি না-ও থাকে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ধূমপান
- তামাক
- ডায়াবেটিস ঝুঁকি