যৌথ নদী কমিশনে ছোট নদীগুলো নিয়েও কাজ করার আছে
ফেনীর বন্যার কারণ হিসেবে অনেকে কুমিল্লার গোমতী নদীর পানিকে দায়ী করছেন। ৩০ বছরেও বন্যা হয়নি এখন কেন বন্যা? ফেনী ও নোয়াখালীতে কেন এমন ভয়াবহ বন্যা হলো? এমন অসংখ্য প্রশ্ন রয়েছে পাঠকের মনে।এসব নিয়ে দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে কথা হয় দেশের অন্যতম পানিবিজ্ঞানী ইমেরিটাস প্রফেসর ড. আইনুন নিশাতের সঙ্গে।
দেশের পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ এই বন্যার কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
ড. আইনুন নিশাত : আমরা লক্ষ করছি যে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী ও পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়িতে বন্যা হচ্ছে। এই জেলাগুলোর অবস্থান লক্ষ করলে দেখা যায়, এগুলোর পূর্ব দিকে ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলের অবস্থান। এখন এই পাহাড়ি এলাকায় যখন হঠাৎ করে অতিবৃষ্টি হবে তখন বন্যা না হওয়াটাই অস্বাভাবিক।

তাহলে কি আপনি মনে করছেন হঠাৎ করে অতিবৃষ্টির কারণে এই বন্যা?
ড. আইনুন নিশাত : হঠাৎ করে শব্দটা পুরোপুরি সঠিক নয়। কোনো এলাকায় যখন ভারী বা অতিভারী বৃষ্টি হবে আবহাওয়া অধিদপ্তর আগে থেকে পূর্বাভাস দিয়ে থাকে। আমরা যদি ভারতের দিকে দৃষ্টি দিই তাহলে দেখব নয়াদিল্লিতে যখন অরেঞ্জ কালারের বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তখন ত্রিপুরায় দেওয়া হয়েছে রেড কালার। অর্থাৎ, বৃষ্টিপাতের ধরন বিবেচনায় কিন্তু তারা আগে থেকেই একটা পূর্বাভাস দিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর তাদের বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসেও কিন্তু বলেছে দেশের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে ভারী বৃষ্টিপাত হবে। আমার জানা মতে, ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে গঠিত যৌথ নদী কমিশনের চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যের আদান-প্রদান রয়েছে। তাই ভারী বৃষ্টিপাত হঠাৎ হয়েছে তা শতভাগ বলা যাবে না।
শুধু কি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসের সঙ্গেই এই বন্যার সম্পর্ক?
ড. আইনুন নিশাত : বৃষ্টিপাত হলো বন্যার একটি প্রধান কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ভারত থেকে তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র, সোমেশ^রী, সুরমা, কুশিয়ারা, পিয়াইন, মনু, খোয়াই, তিতাস, গোমতী, ফেনী ও মুহুরীসহ যেসব নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে সেগুলোর পানিপ্রবাহ। এখন উজানে এসব নদীর পানি বেড়ে গেলে কিংবা নদীর কোন পর্যায় পর্যন্ত পানি এসেছে তা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা সতর্কীকরণ ও পূর্বাভাস কেন্দ্রের জানার কথা। যৌথ নদী কমিশনের আওতায় উভয় দেশের মধ্যে নদীর পানির উপাত্ত আদান-প্রদানের চুক্তি বলবৎ রয়েছে। আর সেই অনুযায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ড তাদের ওয়েবসাইটে বন্যার একটি পূর্বাভাসও দিয়ে থাকে। কিন্তু তাদের পূর্বাভাসটি ওয়েবসাইটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই পূর্বাভাস জোনভিত্তিক কালার কোডের মাধ্যমে জনবান্ধব করে প্রচার করলে সাধারণ মানুষ জানতে পারবে।

কিন্তু ফেনীতে যে আকস্মিক বন্যা হচ্ছে এই বন্যা কি গোমতী নদীর উজানে থাকা ডম্বুর ড্যামের গেইট খুলে দেওয়ার কারণে?
ড. আইনুন নিশাত : এখানে দুই এলাকার দুটি পৃথক পানি প্রবহমান ব্যবস্থা রয়েছে। কুমিল্লার গোমতী নদীর পানি কখনো ফেনীতে যাবে না। ডম্বুর গেইট বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত থেকে ১২০ কিলোমিটার উজানে। আর তা খুলে দিলে গোমতী নদীতে পানি বৃদ্ধি পাবে। এতে গোমতীর অববাহিকা অঞ্চল কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার অংশবিশেষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গোমতী দিয়ে পানি মেঘনায় গিয়ে মিলিত হয়ে থাকে। এই পানি কখনোই ফেনীর দিকে যাবে না। তাই ডম্বুরের গেইট খুলে দেওয়া বা না দেওয়ার সঙ্গে ফেনীর বন্যার কোনো সম্পর্ক নেই।
তাহলে ফেনী ও নোয়াখালীসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যা কেন হচ্ছে?
ড. আইনুন নিশাত : ওই যে প্রথমেই বলেছি এসব এলাকার পূর্ব দিকের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে কম সময়ে অধিক বৃষ্টিপাত হয়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ এলাকা ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লায়ও প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। উভয় এলাকার বৃষ্টিপাতের পানি প্রবলবেগে পাহাড়ি ঢল আকারে ভাটির দিকে (সাগরের দিকে) নেমে এসেছে। আর এতেই ফেনীতে ব্যাপক বন্যা। এই এলাকার মুহুরী ও ফেনী নদী দিয়ে পানি বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিলিত হয়ে থাকে। পূর্ব দিকের পাহাড়ি এলাকা এবং আমাদের ওপারে ত্রিপুরা এলাকায় বৃষ্টিপাত কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই এসব এলাকার বন্যা কমে যাবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- আকস্মিক বন্যা