করোনা ভ্যাকসিন : অবিশ্বাসের গ্রাফ তুঙ্গে উঠল
প্রতি ১০০ বছর পরপর দুনিয়ার ওপর যে কোনো একটা মহামারী আসে। ১৯১৮-১৯২০ এ দুই বছর দুনিয়াটা স্প্যানিশ ফ্লুর দখলে ছিল। স্প্যানিশ ফ্লু রোগটিকে ইনফ্লুয়েঞ্জা প্যানডেমিক নামেও ডাকা হয়। রোগের নাম স্প্যানিশ ফ্লু হলেও রোগের জন্ম স্পেনে হয়নি। এর উৎপত্তিস্থল ছিল আমেরিকার কেনসাস। ওখান থেকে রোগটি সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে গেলে স্পেনের রাজা আলফনসো এতে আক্রান্ত হয়ে রোগে ভুগে বেঁচে গিয়েছিলেন। রাজা আলফনসো এ রোগে ভুগেছিলেন বলে একে স্প্যানিশ ফ্লু নামে ডাকা হয়। দুই বছর ধরে চলা রোগ স্প্যানিশ ফ্লু পৃথিবীর তিন ভাগের এক ভাগ মানুষকে আক্রান্ত করেছিল। স্প্যানিশ ফ্লু রোগে দুনিয়াজুড়ে ৫ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল বলে বলা হয়। তবে মৃতের সংখ্যা এর অনেক বেশিও হতে পারে কারণ সে সময় পৃথিবীর সব দেশে মৃত্যুর তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করা হয়নি। ১০০ বছর পার হতে একেবারে ঘড়ির কাঁটা ধরে ২০১৯ সালে দুনিয়ার ওপর করোনা প্যানডেমিক শুরু হয়ে গেল। করোনার আগমনের ধরন দেখে মনে হচ্ছে এ যেন কোনো নির্জন দ্বীপে কিংবা কোনো পাহাড়ের গুহায় লুকিয়ে বসে ক্যালেন্ডারের দিকে চেয়ে দুনিয়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য ক্ষণ গুনছিল। ক্যালেন্ডারের পাতা ১০০ বছরের ঘর ছুঁয়ে দিতে করোনা তার নিজস্ব পরিকল্পনামাফিক দুনিয়ার বুকে খেল দেখাতে শুরু করেছে। করোনার কারণে পৃথিবীর ধনী-গরিব সব দেশ নাস্তানাবুদ। গণমাধ্যম কিংবা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় সর্বত্র এখন করোনার রাজত্ব। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় একজন জীববিজ্ঞানীর কাছে আমি প্যানডেমিকের কারণ জানতে চেয়েছিলাম। জবাবে তিনি যা বললেন তা আমাদের অনেকের মনঃপূত হবে না। জীববিজ্ঞানী ভদ্রলোক বললেন, প্রকৃতি তার নিজের নিয়মে নিজের ব্যালান্স রক্ষা করে। ১০০ বছর পরপর দুনিয়ার ওপর একটা প্যানডেমিকের ঝড় এলে তাতে মানুষ প্রজাতির বাড়বাড়ন্ত একটু ধাক্কা খায়। আমার করুণ মুখভঙ্গি দেখে জীববিজ্ঞানীর মনে বোধহয় দয়া হয়েছিল। সেজন্য তিনি শান্ত গলায় বললেন, আসলে প্যানডেমিকের কারণ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা আজও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। তবে আমার মনে হয়, মানুষ ভুলে যায় যে তারাও প্রকৃতির অমোঘ অংশ। উন্নত জীবন-জীবিকার জন্য মানুষ সৃষ্টির আদি থেকেই চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা করবে। কিন্তু দাও দাও খাই খাই রব তুলে সবকিছুর ওপর হামলে পড়ে ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠা মোটেও ভালো নয়। ওতে প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মরীতি বাধাগ্রস্ত হয়। তবে এটা মনে রেখ, এ প্যানডেমিক পৃথিবীর সব মানুষকে কষ্টে ফেলে দেবে কিন্তু এ বিপর্যয় থেকে মানুষ কিছুই শিখবে না। মানুষ যেমন ইতিহাস থেকে কিছু শেখে না তেমন মানুষের নিয়ম হচ্ছে তারা প্যানডেমিক থেকে কোনো কিছু শেখে না। মানুষ যদি ১৯১৮-২০ সালের স্প্যানিশ ফ্লু থেকে কিছু শিখত তাহলে ২০২০-২১ সালে করোনা পৃথিবীকে এমন অপ্রস্তুত অবস্থায় নাজেহাল করতে পারত না। স্প্যানিশ ফ্লুর শিক্ষা মাথায় থাকলে উন্নত দেশগুলো এবং হামবড়ামি করে যারা নিজেদের উন্নত বলে দাবি করে তাদের দুর্দশা এমন চরম সীমায় পৌঁছাতে পারত না। দুনিয়ার উন্নত দেশগুলো তাদের জনস্বাস্থ্যকে কতখানি হেলা করেছে করোনা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে যাচ্ছে।