গুজরাটের ফল আশা জোগাচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরে

গুজরাট এবং হিমাচল প্রদেশ বিধানসভার ফলাফল ঘোষিত হয়েছে। এই দুটি রাজ্যের ভেতরে গোটা দেশের মানুষের সব থেকে বেশি আগ্রহ ছিল গুজরাটকে ঘিরে। গুজরাটে শাসক বিজেপি জিতেছে। তবে তাদের আসন সংখ্যা একশোর নিচে নেমে এসেছে। খোদ দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজ্যে শাসক বিজেপির বিধানসভায় আসন সংখ্যা দুই অঙ্কের সংখ্যার ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকা আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে একটা বিশেষ ইঙ্গিতবাহী যে হয়ে উঠবে- সে কথা হলফ করে বলা যায়। কংগ্রেস সে রাজ্যে ক্ষমতা দখল করতে পারেনি। তবে বিধানসভার ভেতরে তারা যেভাবে ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলবে বিজেপির তা সেখানকার শাসকদের পক্ষে যে আদৌ সুখপ্রদ হবে না- তা হলফ করে বলা যায়। যে সমস্ত নির্দল গুজরাটে জিতেছেন, যেমন- জিগ্নেশ, তাদের নিয়ে ঘোড়া কেনা-বেচাও অমিত শাহেরা করতে পারবেন না বলেই মনে হয়।

নরেন্দ্র মোদির দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পিছনে গুজরাটকে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করেছিল গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি। প্রথমে ‘ভাইব্রান্ড গুজরাট’ এবং পরবর্তীতে ‘গুজরাট মডেল’ নামক এমন একটি সোনার পাথরবাটি তুলে ধরা হয়েছিল, যা মোদিকে সাউথ ব্লকে পৌঁছতে অনেকখানি সাহায্য করেছিল। গুজরাট গণহত্যার নায়ক নরেন্দ্র মোদি মুসলমানের রক্তে লাল হয়ে থাকা তার হাতটিকে আড়াল করেছিলেন এই গুজরাট মডেল নামক তথাকথিত উন্নয়নের ‘কাঁঠালের আমস্বত্ত্বের’ আড়ালে। বস্তুত দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও মোদি একটি মুহূর্তের জন্যে ভুলতে পারেননি তার প্রাদেশিক অস্তিত্বকে। তাই প্রথমে আনন্দীবেন প্যাটেলকে তার ছেড়ে আসা মুখ্যমন্ত্রীর তখতে বসিয়েও বেশি দিন নিশ্চিন্ত থাকতে পারেননি মোদি। প্রসঙ্গত- মোদির মুখ্যমন্ত্রিত্বকালেই প্যাটেল সংরক্ষণের যে দাবি গুজরাটে ধূমায়িত হচ্ছিল, আনন্দীবেনের মুখ্যমন্ত্রিত্বকালে হার্দিক প্যাটেলের নেতৃত্বে তা আছড়ে পড়ে গোটা রাজ্যে।

প্যাটেল সংরক্ষণের প্রশ্নে যখন গুজরাট উত্তাল হয়ে উঠছে মোদি কিন্তু তখনই অনুভব করেছিলেন গণহত্যার সময়কালে আরএসএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ) যে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং সে রাজ্যে চালিয়েছিল, সময়ের নিরিখে তার ভিত অনেক আলগা হয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে টাটাদের ন্যানো গাড়ির প্রকল্প পাড়ি দিয়েছিল গুজরাটের সানন্দে। কৃষি জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে যে উত্তাপ এ রাজ্যে তৈরি হয়েছিল, তার বিন্দু বিসর্গও দেখা যায়নি সানন্দে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাহলে কি সেখানে গাড়ির কারখানা করার জন্যে মোদি বন্ধ্যা, পাথুরে জমি নিয়েছিলেন? যে জমি নেওয়ার কোনো প্রতিক্রিয়াই গুজরাটের কৃষক সমাজের ভেতরে হয়নি?

আদৌ ব্যাপারটা তেমন ছিল না। দেশি-বিদেশি বহুজাতিক পুঁজিকে নিজের তাঁবে এনে মোদি সেখানে জমি অধিগ্রহণের কাজ করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সেই সময়ের বামফ্রন্ট সরকার যেহেতু বাজার অর্থনীতি, নয়া উদারীকরণের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন, তাই তাদের যেকোনো পদক্ষেপই দেশি-বিদেশি বহুজাতিক পুঁজির ধারক-বাহকদের কাছে ছিল গর্হিত অপরাধ। মোদি যেহেতু বাজার অর্থনীতির ঘোরতর সমর্থক, নয়া উদারীকরণের পৃষ্ঠপোষক, তাই তিনি যাবতীয় বহুজাতিকদেরই পরম বন্ধু। সেই কারণেই পশ্চিমবঙ্গে প্রস্তাবিত ন্যানো প্রকল্পের থেকে ঢের বেশি জমি গুজরাটের সানন্দের ন্যানো প্রকল্পের জন্যে অধিগ্রহণ করা হলেও তা নিয়ে তেমন একটা শোরগোল হয়নিই বলা যেতে পারে।

মোদির মুখ্যমন্ত্রিত্বকালীন সময় থেকে তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময়কাল- এই দীর্ঘ সময়ে গুজরাটের সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ যে আদৌ ভালো নেই- তা সেখানকার সদ্য সমাপ্ত ভোটের ফল থেকে খুব ভালোভাবে পরিষ্কার হয়ে গেল। মোদির যে তথাকথিত গুজরাট মডেল, সেই মডেলে যে মেহনতি জনতার আদৌ কোনো রকমফের ঘটেনি তা গ্রামীণ গুজরাটে বিজেপির খারাপ ফল থেকে খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারা যাচ্ছে। দু-চারটি শহরের ঝাঁ চকচকে ভোলবদল দেখে গোটা গুজরাটকে এক বিন্দু বুঝতে পারা যাবে না। খোদ শহরগুলোতে উন্নয়নের নামে ব্যাপক উচ্ছেদ হচ্ছে। সেইসব উচ্ছেদ হওয়া মানুষজনদের আদৌ কোনো সুষ্ঠু পুনর্বাসন হচ্ছে না। আর এই পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে ও ভয়াবহ হিন্দু-মুসলমান বিভাজন করা হচ্ছে। আরএসএস-বিজেপি-মোদির সেই বিভাজনের রাজনীতির অবশ্যম্ভাবী ফল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, বিজেপির এই একশর নিচে আসন সংখ্যা নেমে আসার ভেতর দিয়ে।

নিজের রাজ্যের ভোটকে কার্যত দেশের সাধারণ নির্বাচনের মতো গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। অতীতে পণ্ডিত নেহরু থেকে ইন্দিরা, রাজীব, পি ভি নরসিংহ রাও, দেবগৌড়া এমনকি বাজপেয়ির আমলেও প্রধানমন্ত্রীর নিজের রাজ্যের ভোটকে ঘিরে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর এ রকম ব্যস্ততা দেখা যায়নি, যেটা গুজরাট বিধানসভার সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন উপলক্ষে মোদি দেখালেন। গুজরাটের ভোটের অনেককাল আগে থেকেই প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং তার মন্ত্রিসভার বেশ কিছু সদস্য প্রায় ঘাঁটি গেড়ে বসেছিলেন গুজরাটে। বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ তো ছিলেনই। এত কিছু স্বত্ত্বেও তাদের আসন সংখ্যা একশর নিচে নেমে গেছে। গ্রামীণ গুজরাটে বিজেপির ভোট ব্যাংকে যে বিরাট ধস নামতে চলেছে, সেটা ভোটের প্রচার পর্বেই বুঝতে পারা গিয়েছিল। ভোটের ফলে দেখা গেছে, অনুমান সত্য বলেই প্রমাণিত হয়েছে।

গ্রামীণ গুজরাটে বিজেপির এই শোচনীয় ফলাফলের জন্যে অবশ্যই বড় কারণ হলো পাতিদারদের আন্দোলন। গুজরাটে মোদি জামানায় যে কেবলমাত্র উচ্চ বর্ণের পৌষ মাস প্রাপ্তি হয়েছে তা প্যাটেল সংরক্ষণের দাবিতে হার্দিক প্যাটেলদের আন্দোলনের ভেতর দিয়ে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সেই আন্দোলনের ছাপ যে সদ্য সমাপ্ত গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের ওপরে বেশ ভালোভাবেই পড়েছে, তা আর বলবার অপেক্ষা রাখে না। কেবলমাত্র প্যাটেল সম্প্রদায়ই নয়, আরও বহু দলিত জনগোষ্ঠীর মানুষ গুজরাটে গত কয়েক বছরে বিজেপির উচ্চ বর্ণের মনুবাদী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করেছে। 

এবারের ভোটের ফল এভাবে বিজেপির কানের পাশ দিয়ে বেড়িয়ে যাওয়ার পেছনে অল্পশ ঠাকুর, জিগ্নেশ মেভানি প্রমুখ দলিত আন্দোলনের নেতাকর্মীদের একটা বিরাট ভূমিকা আছে। ভোটের শতাংশের হারে শাসক বিজেপি পেয়েছে ৪৯.১ শতাংশ ভোট। কংগ্রেস পেয়েছে ৪১.৪ শতাংশ ভোট। অন্যান্যরা পেয়েছেন ৯.৫ শতাংশ ভোট। একাধিক আসনে বিজেপির জয়ের ব্যবধান অতি সামান্য। যে গোধরাকে ঘিরে গুজরাট গণহত্যা, খোদ সেই বিধানসভা কেন্দ্রেই বিজেপি জিতেছে মাত্র ২৫৮ ভোটের ব্যবধানে। পোরবন্দর, যেটি কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত ছিল, সেখানে বিজেপি জিতেছে ১৮৫৫ ভোটের ব্যবধানে। ঢোলকা বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি জিতেছে মাত্র ৩২৭ ভোটে।

গুজরাটের ভোট পর্বের আগে রাহুল গান্ধীকে রাজনীতিক হিসেবে খাটো করে দেখাটাই প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং তার দেখাদেখি বিজেপির প্রায় সকলেরই দস্তুর হয়ে উঠেছিল। রাহুল গান্ধী কিন্তু গুজরাটে প্রচারপর্ব শুরুর মুহূর্তে প্রচণ্ড রাজনৈতিক আক্রমণ শুরু করেন। প্রশ্ন তোলেন, মোদির তথাকথিত উন্নয়ন আর গুজরাট মডেল নিয়ে। আক্রমণ শানান নোটবন্দির ফলে সাধারণ মানুষের দুর্দশাকে ঘিরে। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন জিএসটির উদ্দেশ্য নিয়ে। এই জিএসটির ফলে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি ব্যবসায়ীরা যে চরম দুর্দশার ভেতরে পড়েছেন তাদের নিয়ে প্রশ্ন তোলেন রাহুল। 

গুজরাটের ঐতিহ্যশালী বস্ত্র শিল্পও যে জিএসটির দারুণ একটা ভয়াবহ সঙ্কটের মুখে এসে পড়েছে, তা ভোটের প্রচারে তুলে ধরেন রাহুল। এর পাশাপাশি পাতিদার আন্দোলনের নেতা হার্দিক প্যাটেলের সঙ্গে রাহুলের দলের একটি নির্বাচনি বোঝাপড়াও হয়ে যায়। উল্লেখ করতে হয় যে, এই হার্দিক প্যাটেলকে নিজেদের শিবিরভুক্ত করতে কম চেষ্টা করেনি গৈরিক শিবির। শেষ পর্যন্ত হার্দিকের সঙ্গে যখন কংগ্রেসের নির্বাচনি বোঝাপড়া প্রায় নিশ্চিত, তখনই হার্দিকের চরিত্র হননের উদ্দেশ্যে বাজারে একটি ভিডিও ছাড়া হয়। এই ভিডিওটি সোশাল সাইটে ছড়িয়ে পড়ার পর দেখা গেল হার্দিকের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ার চেয়ে ভিডিওটিকে ঘিরেই মানুষের বিষোদ্গার চরমে পৌঁছেছে। ফলে সেখানকার বিজেপি নেতৃত্বকে রীতিমতো সাংবাদিক বৈঠক করে বলতে হয়েছিল যে, ওই ভিডিওটিকে প্রকাশ্যে আনার সঙ্গে বিজেপির কোনো যোগসূত্র নেই।

ভোটের প্রচারে রাহুল রাজনৈতিক প্রসঙ্গ যত বেশি তুলতে শুরু করলেন দেখা গেল যেন দেওয়ালে পিঠ থেকে যাওয়ার মতোই গোটা প্রসঙ্গটি অরাজনৈতিক দিকে ঘুরিয়ে দিতে তৎপর হয়েছে বিজেপি। রাজনৈতিক প্রসঙ্গকে অন্য খাতে বইয়ে দিতে এই সময়ে সদলবলে আসরে নেমে পড়ে বিজেপির মূল চালিকা শক্তি আরএসএস। রাহুল এবং হার্দিক, জিগ্নেশ, অল্পেশরা যেসব রাজনৈতিক প্রশ্নগুলি তুলে ধরছিলেন তাতে যে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির বেশ ভালো রকমেরই কোনঠাসা হয়ে পড়ছিল, তা খোদ প্রধানমন্ত্রী বিপক্ষ শিবিরের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রমণের রকম সকম দেখে বোঝা যাচ্ছিল। এই রাজনৈতিক বিতর্কের ভেতরেই কার্যত রাজনৈতিকভাবে কোনঠাসা হয়ে পড়ে খোদ দেশের প্রধানমন্ত্রী গুজরাটে ভোট প্রচারের প্রচার সম্বল করে তুললেন মেরুকরণের রাজনীতিকে।

মন্দিরে গিয়ে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের ভেতর দিয়ে চিরাচরিত রাজনৈতিক পথে হাঁটতে শুরু করলেন মোদি। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, মোদির এই ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের উগ্রতার মোকাবিলা করতে মন্দিরে মন্দিরে ঘুরতে শুরু করলেন রাহুল গান্ধী। মোদির উগ্র সাম্প্রদায়িকতার মোকাবিলায় রাহুল ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার শুরু করলেন অত্যন্ত নরমভাবে। রাহুলের সোমনাথ মন্দিরে যাওয়া নিয়ে সাম্প্রদায়িকতাকে একটা চরম উগ্রতায় প্রতিষ্ঠিত করে চরম বিভাজনের রাজনীতি করতেই যাবতীয় শিষ্টাচারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী আক্রমণ করলেন রাহুলকে। রাহুলের ধর্মীয় পরিচয়কে ঘিরে একদিকে প্রশ্ন তুললেন খোদ প্রধানমন্ত্রী মোদিসহ শীর্ষ স্তরের বিজেপি নেতারা। অপর দিকে রাহুল আদৌ হিন্দু নন বলে গোটা গুজরাটে প্রচার জুড়ে দিলো আরএসএসসহ গোটা সঙ্ঘ পরিবার।

মোদি দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দিন থেকেই গুজরাটি অস্মিতাকে সম্বল করে এই বিধানসভার ভোটকে পাখির চোখ করে সামাজিক প্রযুক্তির কাজে গোটা গুজরাট জুড়ে নিত্য নতুন কলাকৌশলের প্রয়োগ আরএসএস শুরু করে দিয়েছিল। গুজরাট গণহত্যার কাল থেকেই চরম মুসলিম বিরোধী যে বাতাবরণ হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি গোটা গুজরাট জুড়ে কায়েম করে রেখেছিল, মোদির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগে তাকে গোটা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তারা পায়। ক্রমাগত মব লিঞ্চিং, গোরক্ষার নামে মুসলিম হত্যা, একটা বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কার্যত অর্থনেতিক অবরোধ, লাভ জেহাদ ইত্যাদি আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ণের ফলে যে মেরুকরণকে হিন্দুত্ববাদীরা তীব্র করে তুলেছিল তাকেই রাহুলের রাজনৈতিক আক্রমণের মোকাবিলাতে সর্বশক্তি দিয়ে তারা পথে নামিয়ে দেয়।

যে সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিংটা আরএসএস এবং তার সহযোগী সংগঠনগুলি গুজরাটে মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই চালাতে শুরু করেছিল, সেই প্রক্রিয়াটি প্রথমে খানিকটা থমকে গিয়েছিল হার্দিক প্যাটেল, জিগ্নেশ, অল্পেশদের আন্দোলনের ফলে তৈরি হওয়া গণজাগরণের জোয়ারে। মোদি দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উত্তরপ্রদেশে বিজেপিকে জেতানোর জন্যে যে সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং আরএসএসসহ গোটা সঙ্ঘ পরিবার শুরু করেছিল, তা আশ্চর্য রকমের সাফল্য পেয়েছিল এই কারণে যে, সেখানে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না। গুজরাটে রাহুল যে পর্যায়ে রাজনৈতিক লড়াই লড়েছেন, দ্বিতীয় দফার ইউপিএর আমলে উত্তরপ্রদেশে মুজফফরনগরের দাঙ্গার পর তার এক শতাংশ ও যদি কংগ্রেস বা তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার বা উত্তরপ্রদেশের সেই সময়ের অখিলেশ যাদবের সরকার লড়তেন, তাহলে সেখানে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির এই সামাজিক প্রযুক্তি করণের ভেতর দিয়ে সামাজিক বিভাজন তৈরি করে বিজেপির জন্যে নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা এনে দেওয়াটা এত সহজসাধ্য হতো না।

এই কাজটি কার্যত সলতে পাকাবার মতো করে পাতিদার আন্দোলনের কাল থেকে করতে শুরু করেছিলেন হার্দিক, অল্পেশ, জিগ্নেশরা। সেই প্রক্রিয়াকেই একটা বড়ো রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিজেপি- আরএসএসের দিকে ছুড়ে দেন রাহুল। তার এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলাতে উগ্র মেরুকরণের রাস্তায় হাঁটতে শুরু করেন খোদ দেশের প্রধানমন্ত্রী। এই উগ্রতার মোকাবিলায় রাহুল কত ধর্মনিষ্ঠ হিন্দু তার ব্যাখ্যা না দিয়ে কংগ্রেস যদি নেহরু মডেলের ধর্মনিরপেক্ষতার পথে হাঁটত, তাহলে আশা করা যায় মোদির নোংরা বিভাজনের রাজনীতিকে আরও জোরদার ভাবে মোকাবিলা করতে পারত কংগ্রেস। ফলে ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের ফলাফল আরও ভালো হতো।

বিভাজনের নগ্ন রাজনীতি ভোট প্রচারের শেষ পর্বে দেশের প্রধানমন্ত্রী করে তিনি তার রুচির পরিচয় রেখেছেন। গুজরাট গণহত্যার প্রত্যক্ষ মদতদাতা মোদি। যার হাত হাজার হাজার মুসলমানের রক্তে লাল হয়ে আছে। তিনি রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক আক্রমণের বিরোধিতা করতে গিয়ে কার্যত দিশাহীন রাজনীতিকের মতো প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং, প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানের দূতাবাসের কর্মীদের সঙ্গে বসে গুজরাটে বিজেপিকে হারাবার ষড়যন্ত্র করছেন বলে গুরুতর অভিযোগ করলেন। হিন্দু-মুসলমানের আড়াআড়ি বিভাজন না ঘটিয়ে গুজরাট দখলের জন্যে আর কোনো বিকল্প পথ তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে খোলা ছিল না। মোদির এই বিভাজনের রাজনীতির সমুচিত জবাব গুজরাটের মানুষ দিয়েছেন।

বিজেপি গুজরাটে ক্ষমতা দখল করেছে ঠিকই। তবে এই জয় গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবিরের কাছে আদৌ স্বস্তিদায়ক হয়নি। খোদ মোদির জন্ম শহরে বিজেপি হেরে গেছে। উত্তর প্রদেশের ভোটের পর বিজেপির বশংবদ একটি গোষ্ঠী শীবাকীর্তন জুড়েছিল যে; তাৎক্ষণিক তিন তালাক নিয়ে বিজেপির অবস্থানের জেরে নাকি মুসলিম নারীরা মুসলিম খাদক বিজেপিকে দু’হাত ভরে ভোট দিয়েছিল। সেইসব তত্ত্ববিদেরা গুজরাট ভোটের নর আর কোনো তত্ত্বের অবতারণা করবার আর সাহস দেখায়নি। গুজরাটের ভোট এটাই প্রমাণ করেছে যে, সঠিক রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনেতিক প্রতিরোধ থাকলে আরএসএস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি ও তাদের সহযোগী সংগঠন খুলির সামাজিক প্রযুক্তিকে ভোঁতা করে দেওয়া যায়। তাই গুজরাট বিধানসভার এই ফল আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে একটা বিরাট প্রভাব যে ফেলবে- তা এখনই হলফ করে ফলতে পারা যায়। ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের আন্তরিকতাপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াই যে সাম্প্রদায়িক শিবিরকে কোনঠাসা করে দিতে পারে, তা গুজরাট করে দেখিয়ে দিয়েছে।

গৌতম রায়: প্রাবন্ধিক। পেশায় অধ্যাপক, গবেষক। দীর্ঘদিন অন্নদাশঙ্কর রায়ের সাহিত্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]