ছবি সংগৃহীত

পরিবেশ ও একটি বাস্তব খন্ডগল্প

আবু এন এম ওয়াহিদ
লেখক
প্রকাশিত: ০৬ অক্টোবর ২০১৫, ১৬:১৯
আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০১৫, ১৬:১৯

ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত (প্রতীকী অর্থে) 

মার্কিন যক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে টেনেসী অঙ্গরাজ্যের রাজধানী ন্যাসভিলের এক প্রান্তে অবস্থিত বেলভিউ উপশহরে আমরা থাকি। বেলভিউ টাউনশীপ, ডাউনটাউন ন্যাসভীলের বিশ পচিশ মাইল পশ্চিমে। অসংখ্য গাছগাছালি আর পাখপাখালির কলতানের মাঝে নদীঘেষা, ঘন সবজে ঘেরা এক নিরিবিলি ছোট্ট সাবডিভিশনে আমাদের বাড়ি। আমাদের পেছনেই এক স্বচ্ছল কষকের বিশাল খামার। খামারে ফল-ফসল কিছুই নেই, আছে কিছু গাছপালা, পশুপাখি, আর একটি পুরনো বাড়ি। সে বাড়িতে কৃষক থাকেন সপরিবারে। চারদিকে বেড়ায় ঘেরা খামার বাড়ির খোলা মাঠে শীত গ্রীষ্ম বারো মাস গরু আর ঘোড়া চরে বেড়ায়। বিকেল বেলা যখনই ঘরের পিছে ডেকে বসি, তখন প্রতিবেশীর শান্তশিষ্ট পশুগুলোকে খেয়েদেয়ে আরাম করতে দেখে আমার রীতিমতো হিংসে হয়, তবে আফসোস হয় না। হিংসে হয় এ জন্য, যে এমন আরাম কবে থেকেই আমার জন্য হারাম হয়ে আছে তার দিন তারিখও মনে নেই। আবার পস্তাই না এ কারণে যে আরাম মানেই তো অলস সময় কাটানো, আর বেআরাম মানে কাজে ব্যস্ত থাকা। এক মনীষী একবার বলেছিলেন, ‘এ জীবনে যত পার কাজ করে নাও, কবরে গেলে ঘমাবার সময় পাবে অফুরন্ত’। কথাটা বলার সময় মনীষীর নিশ্চয়ই ‘মুনকার’ আর ‘নাকির’ ফেরেস্তাদের কথা মনে ছিল না। যাই হোক, প্রতিবেশীর গরু-ঘোড়াকে চরতে দেখে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে ওইসময়কার বাংলাদেশের গ্রামের ছবি।

মনে পড়ে কাচা রাস্তা ধরে পায়ে হেটে স্কুলে যাওয়ার কথা। স্মৃতির চোখে ভেসে ওঠে রাস্তার পাশে রাখাল বালকের গরু চরানোর দৃশ্য, রোদ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঘামে ভেজা শরীরে কষকের কোদাল আর লাঙ্গল দিয়ে মাটি খোড়ার চিত্র। তখন যাকে বলতাম হাল বাওয়া, তাকে আজ অন্যভাবে দেখি। সপ্তাহ ভর এক টকরো জমিতে হালচাষ করে, মাটি কেটে-খড়ে, মই দিয়ে কাদা-পানির মাঠকে সমান করে, লাইন ধরে ধানের চারা লাগিয়ে কষক যখন জমি থেকে উঠে আসে, তখন আপনারা একে বলবেন রোপা ধানের ক্ষেতের জমি। আমি যদি বলি, ‘এ ধানের ক্ষেত নয়, ক্যানভাসে আকা স্কল-কলেজে না যাওয়া এক দক্ষ শিল্পীর চমৎকার এক শিল্পকর্ম, একটা নতুন জীবন্ত ছবি, যা দিনে দিনে বাড়ে, যে ছবি ক’দিন যেতে না যেতে ঘন সবজ হয়ে সোনালি রঙে ভরে উঠে’ তাহলে কি ভুল হবে? 

গ্রামবাংলা থেকে এবার ফিরে আসি ন্যাসভিলে। আমাদের ঘরের পেছনের গাছে কাঠবিড়ালি আর আঙিনায় খরগোসের আনাগোনা চলে হর-হামেশা। কদাচিৎ ঘন গাছবনের নিচে হরিণেরও দেখা পাওয়া যায়। খামার এবং আমাদের বাড়ির সীমানা বরাবর বয়ে গেছে এক ছোট্ট খাল - যেখানে বারো মাস পানি থাকে। এখানে পানি খেতে ওদিক থেকে আসে গরু এবং ঘোড়া, এ দিকের ঝোপ-ঝাড় থেকে যায় বন্য রেকন, স্কুইর‌্যাল। সাপ ও হরিণরাও যে পানি খাওয়ায় ওদের সাথে শামিল হয়।

না, সে কথা নিশ্চিৎ হয়ে বলা যায় না, কারণ এ পথে তারাও চলাফেরা করে। বাড়ির পশ্চিমের ওই বনে পাখির কিচির মিচির আওয়াজ তো সারাক্ষণ লেগেই আছে। বাড়ির পেছনের দিকে আমার মেয়েদের থাকার ঘরগুলো। ছুটিতে তারা বাড়ি এলে রাতে ঘুমোতে পারে না, পাখির কিচিরমিচির আওয়াজ আর নানা জাতের ক্রিকেট ও ঝিঝি পোকার ডাক চলতে থাকে দিনরাত। দু’বোনের এ অভিযোগ লেগেই আছে। তাদের মা সব সময় পীড়াপীড়ি করেন সুন্দর সবুজ বনটি কেটে ফেলতে, কিন্ত আমার অবুঝ মন তো মানে না। মাঝে মধ্যে খোলা দরজা ভেবে উড়ন্ত পাখি জানালার কাচের গায়ে সজোরে আছড়ে পড়ে। গ্লাসে বাড়ি খেয়ে পড়ে গিয়ে নির্বোধ পাখিকে আহত হতেও দেখেছি, হয়ত কোনো কোনোটা মরেও থাকতে পারে। গরমকালে বাড়ির সামনে জিনিয়া বাগানে যখন ফল ফোটে তখন রঙ বেরঙের প্রজাপতির যে মেলা বসে তা দেখার মতো!

বাড়ি থেকে বেরিয়ে মূল রাস্তায় গেলেই, হাতের বা দিকে পড়ে হারপেথ রিভার। নামে নদী হলেও বাংলাদেশি মানদন্ডে এটাকে বড়জোর একটি স্রোতস্বিনী ছোট্ট খাল বলা যায়। এঁকেবেঁকে হারপেথ রিভার বয়ে গেছে পব থেকে পশ্চিম দিকে। হারপেথ রিভারের দক্ষিণ পাড় দিয়ে তৈরি হয়েছে মাইল দেড়েক লম্বা একটা পাকা পায়ে চলার পথ বা ‘জগিং ট্রেইল’। এ পথ দিয়ে বারো মাস আমাদের আশপাশ দু’তিন সাবডিভিশনের লোকজন নিয়মিত পায়ে হেটে চলাফেরা করে। কেউ বাইক চালায়, কেউ কুকুর নিয়ে হাটে, কেউ স্ট্রলারে করে বাচ্চাদের নিয়ে বেড়াতে বের হয়, কেউ আইপডে গান শুনে শুনে জগিং করে, কেউবা প্রিয়ার হাত ধরে খোশগল্পে মাতোয়ারা হয়ে হেলেদোলে চলে - স্ত্রী, না গার্লফ্রেন্ড বোঝার কোনো উপায় নেই, নেই তার কোনো প্রয়োজন।

‘জগিং ট্রেইল’ আর নদীর মাঝখানে আছে বিভিন্ন জাতের ছোট বড় অনেক গাছ। জায়গাটা কাটাবন, ঝোপ-ঝাড়, জংলি ঘাস, আর ঘন লতাগুল্মে ঢাকা। এই জংগলে আছে অসংখ্য কাটাওয়ালা সমিষ্ট রসালো জংলি র‌্যাস্পবেরির গাছ (আকারে কালো জামের চেয়ে ছোট এক ধরণের বিচিবিহীন ফল)। সামারে যখন গাছে র‌্যাস্পবেরি পাকে, তখন ওতে বনের পাখি, কাঠবিড়ালি, আর পাড়ার ছেলেমেয়েরা সমানভাবে ভাগ বসায়। বড়দেরও এখান থেকে বেরি তুলতে দেখেছি, মাঝেমধ্যে আমিও এনেছি। গরমকালে জঙ্গলের পাশ দিয়ে ‘জগিং ট্রেইল’ ধরে হাটার সময় শ্বাস টানলে বাতাসে পাওয়া যায় জংলি ফলের তীব্র মৌ মৌ গন্ধ। চোখ মেললে দেখা যায় ফুটে আছে নানা বর্ণের ছোট বড় বিভিন্ন আকারের বেশুমার ফল। এতসব ফলের নাম নিশানা কোনো বোটানিস্টও বলতে পারবে কিনা আমার সন্ধেহ আছে!

‘টেই্রল’র পশ্চিম প্রান্ত ঘেষে রেললাইন আড়াআড়িভাবে ক্রস করেছে হারপেথ রিভারকে। রেললাইনের আগে, ‘জগিং টেই্রল’ আর নদীর মাঝেখানে আছে দু’তিন একরের একটা খোলা ময়দান। গ্রীষ্মের সন্ধ্যাবেলা ময়দানের পাশে গিয়ে ‘জগিং ট্রেইলের’ ওপর দাড়ালে, প্রায়ই দেখা যায় ছোট্ট এক ঝাক জংলি হরিণ। ঘাস খায়, দৌড়াদৌড়ি করে, খেলে, মাঝে মধ্যে নদীতে নামে পানি খেতে। কেউ তাদের তাড়া দেয় না, ধাওয়া করে না, কেউ তাদের বিরক্ত করে না। শিকার করার তো প্রশ্নই উঠে না, যদিও প্রায় সব আমেরিকানের ঘরেই বন্দুক আছে।

এ হলো আমাদের বাড়ির পারিপার্শ্বিক পরিবেশ। আমার কাছে মনে হয়, এ যেন বাংলাদেশের ঢাকা মহানগর আর উপকূলের সন্দরবনের এক অপরূপ সংমিশ্রণ। আপনারা বলতে পারেন, ‘এ কেমন তুলনা হল? আমাদের সন্দরবনে বাঘ আছে, ঈগল আছে, আপনার ওখানে আছে এগুলো?’ না, আমাদের এখানে বাঘ নেই বটে, কিন্তু ঈগল আছে, তবে একটু ভিন্ন ধরণের। আর তার গল্পই আমার আজকের মল বিষয়। মানষের বসবাস, চলাফেরা, ও কাজ কর্মের ফলে এমন সন্দর পরিবেশও ময়লা হয়, নোংরা হয়, হয় দুষিত। রাস্তার মেরামত, পায়ে চলা পথের ধারের ঘাস কেটে ছেটে পরিষ্কার করে রাখতে হয়। অবশ্য এর বেশিরভাগ কাজই সিটি কর্পোরেশন ও আমাদের সাবডিভিশন কর্তপক্ষ করে থাকে। তারপরও নাগরিক দায়িত্ব বলে একটি কথা আছে। আর এখানেই আমার আসল বয়ানের শুরু।

হরিণচরা মাঠের পাশে আমাদের এক জার্মান বংশোদ্ভুত প্রতিবেশীর বাড়ি। তার বাপ-মার দেওয়া একটা নাম আছে বটে, কিন্তু আমি আজ তার নাম দিলাম ‘রিচার্ড ঈগলম্যান’, কেন, সেটাও আপনা আপনি খোলাসা হয়ে যাবে একটু পরেই। তার বয়স সত্তর ছুই ছুই, ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে বাইরে চলে গেছে। ভদ্রলোক আর তার স্ত্রী আমাদের পাড়ায় থাকেন। আমরা এখানে এ বাড়িতে আসা অবধি ঈগলম্যানকে দেখছি এ অঞ্চলে চলাফেরা করতে। ঈগলম্যান আর দশজনের মতো নন। তিনি বাংলাদেশের অধ্যাপক আব্দল্লাহ্ আবু সায়ীদের মতো পরিবেশ আন্দোলনের একজন সক্রিয় ও একনিষ্ঠ কর্মী। অধ্যাপক সায়ীদের ভাষায়, পরিবেশের ‘লাঠিয়াল’। (কয়েক বছর আগে এক টিভি টক শো’তে পরিবেশ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক সায়ীদ গর্ব ও আত্মতপ্তির সাথে বলেছিলেন, তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি পরিবেশের কী? তখন তিনি জবাব দেন, ‘আমি পরিবেশের লাঠিয়াল’)।

কী সকাল, কী দুপুর, কী বিকাল, (আমি যেহেত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই, তাই আমার অফিসে যাওয়া আসার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই) গাড়ি করে অফিসে যাওয়া আসার পথে প্রায়ই ঈগলম্যানের সাথে আমার দেখা হয়। ঈগলম্যান সব সময় ঘর থেকে হাটতে বের হন দু’টো বৈশিষ্ট্য নিয়ে। প্রথমতঃ তিনি কখনো একা বের হন না, যখনই বের হন, সব সময় তার পাশে থাকেন তার প্রিয়তমা স্ত্রী (নামটা কখনো জিজ্ঞেস করিনি)। দ্বিতীয়তঃ তিনি কোনো সময়ই খালি হাতে বের হন না। সবসময় তার হাতে থাকে একটা গারবেজ ব্যাগ। হেটে স্ত্রীর সাথে কথা বলছেন আর অনবরত রাস্তার এপাশ-ওপাশ থেকে ময়লা আবর্জনা কুড়িয়ে ব্যাগে ভরছেন। রাস্তায় পড়ে থাকা কাগজ, খালি প্লাস্টিকের বোতল, সোডার ক্যান, সিগারেটের বাক্স, গাছের মরা ডাল, কোনো কিছুই তার দৃষ্টি এড়ায় না। কারণ তিনি ঈগলম্যান, তার চোখ ঈগলের মতই তীক্ষ্ণ ও ক্ষমতাসম্পন্ন।

প্রথম দিকে তিনি খালি হাতে ময়লা কুড়াতেন, ইদানিং তাকে দেখা যায় এক হাতে গারবেজ ব্যাগ এবং আরেক হাতে ম্যাকানিক্যাল গারবেজ কালেক্টিং স্টিক। স্টিকের উপরের প্রান্তে আছে একটা ম্যাকানিক্যাল লিভার এবং নিচের প্রান্তে আছে একটা সাড়াশি। উপরের লিভার ধরে চাপ দিলে, নিচের সাড়াশি চিমটির মতো ধরে সব ময়লা আবর্জনা সহজেই তুলে নিয়ে আসে। ঈগলম্যান বছরের পর বছর ধরে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে আমাদের পাড়ায় এ মহৎ কাজটি করে যাচ্ছেন। তার সৌজন্যে আমরা একটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, সুন্দর পরিবেশে বসবাস করতে পারছি।

নিছক কৌতূহল বশত একদিন ঈগলম্যানকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিছ যদি মনে না করো, তাহলে তোমাকে একটা প্রশ্ন করি’?, ঈগলম্যান বললেন, ‘নির্দ্বিধায় করতে পারো’। আমি বললাম, ‘আর তো কেউ করে না, তুমি এ কাজটা কেন কর’? ঈগলম্যান বললেন, ‘এ কাজ সবার, আমি করি বলে সবার ওপর থেকে দায়িত্বটা আদায় হয়ে যায়। আমি যখন থাকব না, তখন এ কাজের বোঝা সবার ঘাড়ে থেকে যাবে’। ঈগলম্যানের কথা শুনে আমি কতক্ষণ বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে রইলাম। ঈগলম্যান হয়তবা জানেন না, কিন্তু তিনি আমাকে মুসলমানদের ‘ফরজে কিফায়ার’ কথা মনে করিয়ে দিলেন। পরিবেশকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখা কোনো ব্যক্তির কাজ নয়। এটা নাগরিক সমাজের সামষ্টিক দায়িত্ব - জানাজা ও দাফন কাফনের মতোই এটা ‘ফরজে কিফায়া’। একজন পালন করলে সবার উপর থেকে আদায় হয়ে যায়, আর কেউ না করলে সবার ঘাড়ে বোঝা হয়ে রয়ে যায়।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা মহানগরে যে কোনো ঈগলম্যানের জন্ম হয়নি, তা আমি বলছি না। তবে এটুকু নিশ্চিত করেই বলতে পারি, দেড় কোটি মানষের শহর ঢাকাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখতে হাজার হাজার না হলেও শত শত ঈগলম্যানের দরকার। অধ্যাপক আব্দল্লাহ্ আবু সায়ীদের পরিবেশ আন্দোলনের সাথে যে মুহূর্তে একজন নতুন ঈগলম্যান যুক্ত হবে, সে মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য রীতিমত সেলিব্রেট করা উচিৎ। অবশেষে, আপনাদের জন্য এ লেখার দু’টো প্রাসঙ্গিক দুঃখের খবর দেওয়া দরকার। প্রথমত, ঈগলম্যান এখন একাই হাটেন, তার প্রিয়তমা স্ত্রী আজ আর বেঁচে নেই, দ্বিতীয়ত, আমার বাড়ির সামনের জিনিয়া বাগানও আর নেই, কেন, কীভাবে, সে গল্প হবে না হয় আরেক দিন।

লেখক: অধ্যাপক - টেনেসী স্টেইট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র; এডিটর - জার্নাল অফ ডেভেলপিং এরিয়াজ