পাসপোর্টের জাতীয়তা ও গায়ের রং: বিশ্বকাপে বর্ণবাদের বহুমুখী চেহারা

বিডি নিউজ ২৪ শোয়েব সাম্য সিদ্দিক প্রকাশিত: ২৩ জুন ২০২৬, ১০:৫৪

ফুটবল বিশ্বকাপকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিলনমেলা। কোটি কোটি মানুষ তখন একসঙ্গে হাসে, কাঁদে, উদযাপন করে। ২০২৬ বিশ্বকাপও সেই উৎসবেরই অংশ।


কিন্তু সবার জন্য বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা এক নয়। মাঠে খেলা শুরু হওয়ার আগেই কিছু খেলোয়াড়, সমর্থক ও কর্মকর্তাকে মুখোমুখি হতে হয়েছে এমন এক বাস্তবতার, যেখানে পাসপোর্টের জাতীয়তাই নির্ধারণ করে দিচ্ছে কে আসতে পারবেন, কে পারবেন না। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ফুটবল কি সত্যিই সবার জন্য, নাকি এখনও কারও গায়ের রং অন্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?


এবারের বিশ্বকাপে বৈষম্যের প্রথম চেহারা ধরা পড়েছে মাঠে নামার অনেক আগেই, বিমানবন্দরে। সেনেগাল জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের রেলি বিমানবন্দরে বোর্ডিংয়ের সময় কড়া নিরাপত্তা তল্লাশির মুখে পড়তে হয়েছে, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। উজবেকিস্তান দলকে বাড়তি নিরাপত্তা পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়েছে। উরুগুয়ে দলের মালপত্র তল্লাশি করা হয়েছে দৃষ্টিকটুভাবে। লাখ লাখ মানুষ এই ঘটনাগুলোকে লজ্জাজনক ও ঘৃণ্য বলেছেন। অনেকে বলেছেন, বিশ্বসেরা খেলোয়াড়দের সঙ্গে অপরাধীর মতো আচরণ করা হয়েছে।


সবচেয়ে নির্মম ঘটনাটি ঘটেছে সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতানকে নিয়ে। আফ্রিকার সেরা রেফারি হিসেবে স্বীকৃত হওয়া সত্ত্বেও তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশাধিকারই দেওয়া হয়নি। কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ জানানো হয়নি। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কারণ একটাই, তিনি সোমালি। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ কেবল ভেটিং উদ্বেগের কথা জানিয়েছে, কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি। প্রকৃতপক্ষে, এখানে ‘ভেটিং উদ্বেগ’ শব্দবন্ধটি কোনো প্রকৃত নিরাপত্তা ঝুঁকিকে নির্দেশ করে না। যখন কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী প্রমাণ করার মতো সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকে না, কেবল তার জাতীয়তার কারণে তাকে আটকে দিতে হয়—তখন মার্কিন প্রশাসন এই অস্পষ্ট ও একপেশে প্রাতিষ্ঠানিক ভীতির দোহাই দেয়।


রয়টার্সের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ইরাকের স্ট্রাইকার আইমেন হুসেইনকে শিকাগোর ও'হেয়ার বিমানবন্দরে প্রায় সাত ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছে, ফোন পরীক্ষা করা হয়েছে। দলের ফটোগ্রাফার তালাল সালাহকে দশ ঘণ্টারও বেশি আটকে রেখে শেষ পর্যন্ত প্রবেশাধিকারই দেওয়া হয়নি। আইমেন হুসেইন সাংবাদিকদের বলেছেন, “বিশ্বকাপ আয়োজন করতে গেলে বিদেশিদের সঙ্গে এত বৈরী আচরণ কেন?” এই প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি কর্তৃপক্ষ।


চিত্রটা আরও উদ্বেগজনক গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে। ইরান দলকে ম্যাচের মাত্র একদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে এবং ম্যাচ শেষ হওয়ার দিনেই দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচের দুদিন আগে আসার অনুমতি চাইলেও তা নাকচ করা হয়। দলের কোচ আমির ঘালেনোই বলেছেন, তার দল এই বিশ্বকাপের ‘সবচেয়ে নিপীড়িত’ দল। ইরান ফুটবল ফেডারেশন ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে বলেছে, এই বিধিনিষেধ অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জন্য সমান সুযোগের নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচের পর লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামের ড্রেসিং রুমে হাতে লেখা একটি চিঠি রেখে যায় ইরান ফুটবল দল। যেখানে লেখা ছিল, “সকল জাতির মধ্যে শান্তি, সম্মান ও বন্ধুত্ব বজায় থাকুক।”


এগুলোকে আলাদা আলাদা ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া সহজ। কিন্তু একসঙ্গে সাজালে ভিন্ন একটা ছবি দেখা যায়। হাইতি, ইরান, আইভরি কোস্ট ও সেনেগালসহ ৩৯টি দেশের নাগরিকের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তারই প্রমাণ। এই নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত দেশগুলো মূলত অশ্বেতাঙ্গ, আফ্রিকান বা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। ফলে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া অনেক দেশের অধিকাংশ সমর্থক নিজেদের দলের খেলা মাঠে বসে দেখার সুযোগই পাননি। তাদের অপরাধ একটাই, তারা ভুল পাসপোর্ট নিয়ে জন্মেছেন।


এর চেয়েও অস্বস্তিকর হলো ভিসা জামানতের বিষয়টি। কয়েকটি আফ্রিকান দেশের নাগরিকদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পনেরো হাজার ডলার পর্যন্ত জামানত দাবি করা হয়েছে। যে অঞ্চলের অনেক মানুষের মাসিক আয় কয়েক ডলারেরও কম, সেখানে এমন শর্তের অর্থ খুব পরিষ্কার। বলা হচ্ছে না যে তোমরা আসতে পারবে না। বলা হচ্ছে, এমন এক দরজা খোলা আছে যা বাস্তবে তোমাদের জন্য বন্ধ। বিষয়টি কেবল ভিসা বা অভিবাসনের নয়। অনেকের কাছে এটি প্রশাসনিক ভাষায় বর্ণবাদ ও বৈষম্যকে বৈধতা দেওয়ার আরেকটি উপায়। মন্দের ভালো যে কেপ ভার্দের খেলোয়াড় ভজিনিয়ার মা যুক্তরাষ্ট্রে আসার অনুমতি পেয়েছেন। স্প্যানিশদের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের নায়ক, কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভজিনিয়া ম্যাচ শেষে অশ্রুসজল চোখে আক্ষেপ করেছিলেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতির উচ্চ খরচের কারণে তিনি তার মাকে বিশ্বকাপে আনতে পারেননি। তার এই আবেগঘন আকুতি ছড়িয়ে পড়লে নড়েচড়ে বসে মার্কিন প্রশাসন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা এড়াতে টিকিটধারী দর্শকদের জন্য এই কঠোর নিয়ম শিথিল করা হয় এবং দ্রুত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভজিনিয়ার মা, ইভোরাকে অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের বিশেষ অনুমতি দেওয়া হয়।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও