ক-বাঙালের কর্ণধার লিজা ও উত্তম। ছবি কৃতজ্ঞতা: ক-বাঙাল

স্বপ্নপূরণের প্রতিজ্ঞা নিয়ে 'ক-বাঙাল'

ফাওজিয়া ফারহাত অনীকা
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ১০ জানুয়ারি ২০১৮, ২১:২৯
আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০১৮, ২১:২৯

(প্রিয়.কম) বলা হয়, জীবনে হতাশার সময়গুলো থেকে যিনি নিজেকে বের করে আনার চেষ্টা করেন তিনি ভবিষ্যৎ জীবনে অনেক সফলতা অর্জন করতে পারেন। লিজার হতাশাজনক সময়গুলো থেকেই মাথা তুলে দাঁড়ায় ক-বাঙ্গাল। নিজের আলাদা একটি পরিচিতি ও নিজের জন্যে কিছু গড়ে তোলার তাগিদ থেকেই বন্ধু উত্তমের সাথে মিলে লিজা গড়ে তোলেন চমৎকার নান্দনিক অনলাইনভিত্তিক হাতে তৈরি পণ্যের দোকান ক-বাঙাল

ক-বাঙ্গালের কর্ণধার আরাত জাহান লিজা পড়ালেখা করছেন শাহজাহান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে বিবিএ করছেন। ক-বাঙ্গালের আরেকজন কর্ণধার উত্তম কুমার দাশ ইংলিশে স্নাতক করছেন সিলেটের মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি থেকে। পেইজের এমন ভিন্নধর্মী নামটি উত্তমের দেওয়া। কারণ জুয়েলারি নিয়ে কাজ করার আগ্রহটা তার মাঝে সবসময়ই ছিল। অন্যদিকে লিজার ছিল অরিগ্যামির প্রতি আগ্রহ।

ক- বাঙাল ছবি ১

বিভিন্ন ধরনের গহনা কিনে নিজেই নিজের পছন্দমতো গহনা তৈরি করতেন। পরীক্ষামূলকভাবে গহনাগুলো তৈরি করে দেখতেন যে, সেগুলো বেশ দারুণ ও নান্দনিক কাজ হচ্ছে। সেই থেকেই তার মাঝে কাজ করত-তিনি একেবারে নতুন গহনা নিজে হাতে তৈরি করতে পারবেন। এ সময়ে তার পাশে থেকে সাহস ও সমর্থন দিয়েছিলেন বন্ধু উত্তম। তার সাথে সকল কাজের পরিকল্পনা করে, ত্রিনিত্রির কর্ণধার অন্বেষা দত্তর সমর্থনে, এক-দেড় মাস সময় নিয়ে বিভিন্ন আনুষঙ্গিক কাজ সামলিয়ে ২০১৭ সালের ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ক-বাঙালের যাত্রা।  

ক- বাঙাল ছবি ২

লিজা ব্যক্তিগতভাবে বাঙালি ঘরানার গহনা ও পণ্য ভীষণ পছন্দ করেন। নিজে চেষ্টাও করেন এমন ধরনের পণ্য সংগ্রহে রাখার জন্য। যে কারণে তার সকল কাজের মাঝে বাংলাদেশ এবং কলকাতার আবহ খুব স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ঐতিহ্যবাহী গহনা তৈরির ক্ষেত্রে লিজা ও উত্তম নজর রাখেন তুলনামূলক বেশি। যে কারণে প্রায় প্রতিটি পণ্য তৈরি করা হয় কাঠ, মাটি, সুতা, কড়ি ও জার্মান সিলভার দিয়ে।

ক- বাঙাল ছবি ৯

যেহেতু বেশিরভাগ গহনা তৈরি করা হয় হাতে, তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর সময়ের প্রয়োজন হয়। হাতে এঁকে অথবা হাতে তৈরি করার ক্ষেত্রে একটি গহনা সম্পূর্ণ তৈরি করতে ২-৩ ঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন হয়। অনেক সময় তার চাইতেও বেশি সময় লেগে যায় একটি গহনা তৈরিতে। হাতে তৈরি করা হয় বলে পণ্যের দামটাও তেমনভাবেই নির্ধারণ করা হয় বলে জানান লিজা।

ক- বাঙাল ছবি ৩

তিনি বলেন, 'কতটুকু মেধা, শ্রম এবং সময় ঢালতে হয় একটা হ্যান্ডমেড গয়নায় তা সবাই বোঝেন না। তার চেয়ে বড় কথা হলো, কতটা যত্ন আর মমতা নিয়ে একটা গয়নার সুতো গাঁথা হয়, একটা গয়নায় তুলির আঁচড় পড়ে তা সবাইকে বোঝানো যায় না। আমি হতাশ হইনি এখনো। কারণ আমি কাজ করে যাচ্ছি হাতে তৈরি গহনা,পণ্যের প্রতি কদর সবার মাঝে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।'

ক- বাঙাল ছবি ৪

লিজা আরো জানান, তারা সবসময় চেষ্টা করেন প্রতিটি পণ্যের মূল্য যথাসম্ভব হাতের নাগালের মাঝে রাখার জন্য। কারণ ক-বাঙালের বেশিরভাগ ক্রেতা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ও কর্মজীবী নারী। তাই পণ্যের দাম রাখা হয় ১০০-১০০০ টাকার মাঝেই। এছাড়া স্বল্প মূল্যে কেনার জন্য ১০০-২০০ টাকার মাঝে রাখা হয় আলাদা কিছু পণ্য।

মোটে এক বছর হতে চলেছে ক-বাঙালের বয়স। এরই মধ্যে ক্রেতাদের কাছ থেকে পেয়েছে বিপুল সাড়া ও ভালোবাসা। যে কারণে কাজের প্রতি ভালোবাসাটাও অনেক বেড়ে যায় বলে জানান লিজা। ২২৬৫টি লাইকের ক-বাঙাল পেইজে রয়েছে ৫ তারা রেটিং। ভিন্নধর্মী আবহে তৈরি সকল গহনাই দুই বাংলার মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে। তার মাঝে ‘যশোমতী’ এবং ‘বাসন্তী-ময়ূরী’ মালাগুলোর জনপ্রিয়তা তুলনামূলক অনেক বেশি।

ক- বাঙাল ছবি ৫

ক-বাঙালের কাজ করার মাঝে ভালোলাগা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে নানা ধরনের বাধা। একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে লিজাকে বেশ কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় প্রতিনিয়ত। কিন্তু সব সমস্যাকে খুবই হালকাভাবে নেন তিনি। একজন নারী বলে এসব সমস্যা দেখে দমে যাবার পাত্র লিজা নন।

এছাড়াও অনলাইন দোকান বলে অনেক ক্রেতারাই ভরসা করতে পারেন না। বিশেষ করে ক-বাঙাল সিলেট শহরে হওয়ায় অন্যান্য শহরের ক্রেতাদের ডেলিভারির ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা ও জটিলতা তৈরি হয়। কুরিয়ারের মাধ্যমে পণ্য পৌঁছাতে সময় বেশি প্রয়োজন হয় বলে ক্রেতারা প্রায়ই মনোক্ষুণ্ণ হন। লিজা এবং উত্তম দুজনই এসব সমস্যা নিরসনে চেষ্টা করছেন।

ক- বাঙাল ছবি ৬

পড়ালেখা, ক-বাঙালের হাজারো কাজের পরেও অন্যদের মতো তারও ব্যক্তিগত জীবন রয়েছে। সেই জীবনে সবার যেমন থাকে মনোকষ্ট কিংবা হতাশা। সেটা তারও রয়েছে। লিজা জানান, তিনিও মাঝে মাঝে মন খারাপ করেন, বিষণ্ণ হয়ে পড়েন। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে ক-বাঙালকে আঁকড়ে তিনি আবারও দাঁড়িয়ে যান।

এই ক-বাঙাল তাকে আলাদা একটি পরিচিতি দিয়েছে। তার সাথে অনেক প্রিয় মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। যে কারণে হতাশা ঘিরে ধরলেই তাদের কাছে ছুটে যেতে পারেন লিজা। অন্তর্জালের মাঝে পরিচিত হওয়া এই মানুষগুলো ইতিমধ্যে তার ভীষণ আপন হয়ে উঠেছে। তার মাঝে অন্যান্য অনলাইন দোকানের কর্ণধারেরাও রয়েছেন। তাদের সাথে আলাপচারিতা ও আলোচনায় অনেক মানসিক শক্তি পাওয়া যায়। লিজা জানান, তিনি কখনোই কারোর মাঝে বিদ্বেষপূর্ণ কিংবা প্রতিযোগিতাপূর্ণ মনোভাব দেখেননি।

ক- বাঙাল ছবি ৭

যেকোনো উদ্যোক্তাকে নিজের প্রতিষ্ঠান ঘিরে পরিকল্পনার কথা জিজ্ঞাসা করা হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একই ধরনের উত্তর পাওয়া যায়। কিন্তু ক-বাঙালের কর্ণধার এক্ষেত্রে শোনালেন একেবারেই ভিন্ন কথা। লিজা বলেন, 'আমাদের অন্যতম একটা পরিকল্পনা আছে। ইতিমধ্যে আমাদের পরিচিত কিছু জনপ্রিয় ক্রাফটার তাদের আয়ের কিছু অংশ দিয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের আর্থিকভাবে সাহায্য করতে চেষ্টা করছেন। আমি সিলেটের কোনো সংগঠন এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ক-বাঙালের আয়ের একটা অংশ ভালোবেসে দিতে চাই। বিশেষ করে লেখাপড়ার জন্য। ইতোমধ্যে কিছু বাচ্চাকে দিতে চেষ্টা করেছি কিন্তু মাঝে কিছুদিন পারিনি। নতুন বছরে ক-বাঙাল নতুন এক আশা এবং স্বপ্ন নিয়ে এগোবে। তা হলে ছোট কোনো শিশুর স্বপ্ন পূরণ করবে প্রতি মাসে।'

ক- বাঙাল ছবি ৮

মহান এক উদ্দেশ্য নিয়েই নতুন বছরে ক-বাঙাল তার যাত্রা শুরু করেছে পুরোদমে। তাদের ইচ্ছা আছে নতুন বছরে নতুন বেশ কিছু কাজ নিয়ে আসবেন সবার জন্য। সাথে অবশ্যই প্রতি মাসে একজন সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে সাহায্য করবেন নিজেদের লাভের অংশ থেকে।

শুভ কামনা থাকল লিজা ও উত্তমের জন্য। এমন মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে ক-বাঙাল যেন আরো অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে।

প্রিয় লাইফ/আরবি/আজাদ চৌধুরী