ছুটির দিনে ঘুরে আসুন সীতাকুণ্ডের ইকোপার্কে
আপডেট: ২১ মে ২০১৫, ০৭:০৪
(মোঃ ইমরান হোসেন, সীতাকুণ্ড, চট্রগ্রাম) পাহাড় এবং সমুদ্র বরাবরই আকর্ষণ করে সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কে ঘুরতে আসা দেশি ও বিদেশি সকল পর্যটকদের মন। প্রকৃতির এ নিবিড় ছোঁয়া আর বুক উজার করা সৌন্দর্য যেন মূহুর্তেই ভুলিয়ে দেয় জীবনের যাবতীয় হতাশা। শীত এলেই শুরু হয় পর্যটন মৌসুম। পাহাড়ি প্রকৃতির একান্ত সান্নিধ্য পেতে আর উচ্ছল ঝর্ণার শীতল স্পর্শ পেতে হলে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড ইকোপার্কই হলো প্রকৃত স্থান। সীতাকুণ্ড পৌরসদর থেকে দুই কিলোমিটার দক্ষিণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে গেলেই ফকিরহাট এলাকায় সীতাকুণ্ড বোটানিকেল গার্ডেন ও ইকোপার্ক। প্রধান সড়ক থেকে পূর্বদিকে এক কিলোমিটার রাস্তা গেলেই ইকোপার্কের প্রধান গেইট। এখানে আগত দর্শনার্থীদের একটু থামতে হবে। কারণ, জনপ্রতি দশ টাকা করে টিকিট কাটতে হবে। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য টিকিটের মূল্যে ছাড় রয়েছে। এরপরই পার্কের সৌন্দর্য পথ মেলে যাবে আপনার সামনে। আপনি ইচ্ছা করলে গাড়ী নিয়ে, কিংবা পায়ে হেঁটে গাছ-গাছালির সু-শীতল ছায়ায় শুরু করুন পাহাড়ের আঁকা-বাঁকা পথযাত্রা। তবে পথযাত্রা শুরুর করার আগে নিজের সুবিধার্থে ইকোপার্ক সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন পর্যটন অফিস থেকে। প্রধান গেইট দিয়ে পার্কে ঢুকলেই পর্যটন অফিস। অফিসের সামনে প্রস্তর ফলকে উৎকীর্ণ আছে ইকোপার্কের মানচিত্র। সুদৃশ্য ল্যান্ডস্কেপ থেকে দর্শনীয় স্থানগুলো বাছাই করে নিতে পারেন। বিস্তারিত জানতে বোটানিক্যাল কার্যালয়ে স্থাপিত মিনি লাইব্রেরী থেকে একটু পড়াশুনাও করে নিতে পারেন। কিছু তথ্য জানা কি ভালো নয় ? অফিসের পাশেই রয়েছে অর্কিড গার্ডেন ও গোলাপ বাগান। ভ্রমণের শুরুতে কিংবা ফেরার পথে তা দেখে নিতে ভুলবেন না একদম ! কিছুদুর উঠলেই রয়েছে সুপ্তধারা জলপ্রপাত। ঝর্ণার সিগ্ধতা পেতে হলে সিঁড়ি ধরে নেমে যান পাহাড়ের তলদেশে। বেশ কিছু সিঁড়ি অতিক্রম করলেই একটি ছাউনি। সেখানে একটু বিশ্রাম নিয়ে পাহাড়ি ঢাল বেঁয়ে নিচে নামতে হবে সর্তকতার সাথে। না হলে গড়িয়ে পাহাড়ের গভীর তলদেশে পড়ার সম্ভাবনা আছে। তবে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা পেতে হলে নিচে না নেমে উপায় নেই। তবে পাহাড়ি ছরা ধরে পাথুরে পথ ধরে পানির শীতলতা নিতে নিতে পৌঁছানো যায় ঝর্ণার একেবারে নীচে। শত ফুট ওপর থেকে অভিরাম গড়িয়ে পড়া ঝর্ণাতে একটু ভেজা বা উঞ্চতা আহরনের আনন্দ আলাদা। সহস্রধারা জলপ্রপাত নামে আরেকটি ঝর্না আছে ইকোপার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের শেষ সীমানায়। তিনশ ফুট সিঁড়ি ভেঙ্গে এবং কিছু পাহাড়ি পথ বেয়ে চলে যাওয়া যায় ঝর্ণার পাদদেশে। এখানে এসে পানির সিগ্ধ পরশ পাওয়ার লোভ সামলানো দায়। লোভ সামলাতে পারেননি আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামও। তাইতো তিনি এই ঝর্ণার পরশ নিতে ১৯২৬ সালে ও ১৯২৯ সালে ছুটে এসেছিলেন। রচনা করেছেন তাঁর বিখ্যাত গান “আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ। ঐ পাহাড়ের ঝর্ণা আমি উধাও হয়ে রইগো।” পাহাড়ের গায়ে প্রস্তর ফলকে উৎকীর্ণ আছে সেই পঙতিগুলো। ঝর্ণা দেখে উপরে এসে কিছু খেয়ে এবং গলাটা ভিজিয়ে নিতে পারেন দোকান থেকে। দাম একটু বেশিই নেবে। কারণ পণ্যগুলো অনেক উপরে বয়ে আনতে হয় যে! পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে উঠে ডুবন্ত সুর্য ও সমুদ্রতট দেখা যাবে পশ্চিমে তাকালে। ছবির মতো দেখতে অদুরবর্তী সমুদ্রের রূপ না দেখলে বুঝা যায়না। পার্কের উত্তর পাশেই রয়েছে চন্দ্রনাথ মন্দির। সর্বশেষে সবকিছু মিলে বলা যায় অপরূপ সৌন্দর্য্যে সীতাকুণ্ডের বোটানিক্যাল গার্ডেন ইকোপার্ক। পত্রিকাতে অথবা অনলাইনে বসে নিউজ পড়লে হকে কি? সত্যিকারে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রসের সুগন্ধ পেতে, উপরে যা বললাম তা দেখতে চলে আসুন এবং ঘুরে যান যান সীতাকুণ্ডের ইকোপার্কে।
যা কিছু সুন্দর
১৯৯৬ একর পার্কটি দুই অংশে বিভক্ত। এক হাজার একর জায়গায় বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ৯৯৬ একরজায়গা জুড়ে ইকোপার্ক এলাকা। ৩টি পিকনিক স্পট, ৮টি বিশ্রাম ছাউনি সম্বলিত ইকোপার্কে রয়েছে- মেছোবাঘ, ভালুক, মায়াহরিণ, বানর, হনুমান, শুকর, বনরুই, সজারু, বনমোরগ প্রভৃতি পশু। দাড়াঁশ, গোখরা, লাউডগা, কালন্তি প্রভৃতি সাপ থাকলেও শীতকালে বের হয় কম। দূলর্ভ কালো গোলাপসহ ৩৫ প্রকার গোলাপ, জবা, নাইট কুইন, লিলি, স্থল পদ্ম, মোসান্ডা, রংগন, রাধা চুঁড়া, কামেনি, কাঠ মালতি, এলামেন্ডা, বাগান বিলাস, হাসনা হেনা, গন্ধরাজ, ফনিকা মিলে রয়েছে ১৫০জাতের ফুল।পর্যটকদের সুবিধার্থে পিকনিক কর্ণার
বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকো-পার্কের উত্তরে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। এ যেন পাহাড়ের স্রোত কেবলই বয়ে চলেছে হাট হাজারী, মন্দাকিনী ও ফটিকছড়ি পর্যন্ত। পাহাড়ের চুঁড়ায় কয়েকটি পিকনিক কর্ণার, বিশ্রামাগার, টয়লেট, বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা রয়েছে।ফুল ও ফলের বাগান
পাহাড়ের মাঝে সৃজিত হচ্ছে ফুল ও ফলের গাছের বাগান যাতে পশু-পাখি তার খাদ্য ও আবাসস্থল ফিরে পাবে। শাল, সেগুন, গর্জন, চাম্পা, আমলকি, আম, জাম, হরিতকি প্রভৃতি কাঠ, ফল ও ঔষধি বৃক্ষ আর লতা- গুল্ম মিলে আছে ১৪৫ প্রজাতির গাছ-গাছালি। বিরল প্রজাতির সাইকাস পার্কটিকে আরো সমৃদ্দ করেছে। এখানে অাধুনিক গ্রীন হাউজ স্থাপন করা হয়েছে। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির দৃষ্টিনন্দন ১০০টি অর্কিট আছে।কৃত্রিম হৃদ
সহস্রধারা ও সুপ্তধারা হতে বহমান জলকে কৃত্রিম বাঁধ তৈরির মাধ্যমে গড়ে উঠেছে লেক, যার পানিতে বোটে ঘুরে বেড়াবে পর্যটকরা। নৌবিহারের সময় পাখির কাঁকলি শুনতে শুনতে লেকের পাড়ে দেখা যাবে বানর, হনুমান, ভালুক গাছ থেকে গাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোথাও বা একপাল মায়া হরিণ লেকের পাড়ে নেমে এসেছে পানি পান করার জন্য।চন্দ্রনাথ মন্দির
পার্কের ডিসপ্লে ম্যাপটি হতে ধারণা নিয়ে গাড়িতে অথবা পায়ে হেটে অনায়াসে পৌঁছে যাওয়া যায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে চন্দ্রনাথ শিব মন্দিরে। মন্দিরে যাওয়ার পূর্বে আঁকা-বাঁকা রাস্তায় এপলকে চোখ পড়বে পাহাড়ে জন্মানো প্রাকৃতিক হৈমন্তি, লেনটোনা ও সোনালুর বাহারী ফুল অথবা দূরে সাদা কাঁশ ফুলের সমারোহ। এরই মাঝে যখন পর্যটকরা ঠিক চন্দ্রনাথ শিব মন্দিরটির নীচে এসে উপস্থিত হবে, তখন তাদের দুইশত বায়ান্নটি সিঁড়ি বেয়ে মন্দিরে উঠতে হবে। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে মোট ষোলশত সিঁড়ি বেয়ে শিব মন্দিরে উঠতে হয়।যেভাবে যাবেন
চট্টগ্রাম শহর থেকে বাস, মেক্সী, টেক্সীতে ৩৭ কি.মি. উত্তরে এলে কিংবা সীতাকুণ্ড থেকে ২কি.মি.দক্ষিণে ইকোপার্ক। সীতাকুণ্ড থেকে পার্ক গেইট পর্যন্ত রিক্সা কিংবা টেক্সীতে সর্বোচ্চ ৪০ টাকা ভাড়া নেবে। সিএনজি ট্যাক্সি নিয়ে পাহাড়ের উপরেও যাওয়া যায় তবে ভাড়া একটু দর-দাম করে নিলেই ভালো। আর নিজস্ব গাড়ী থাকলেতো কথাই নেই। বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকো-পার্কে প্রবেশ মূল্যে জনপ্রতি ১০টাকা। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রতি ১০০জনের জন্য মাত্র ১০০টাকা প্রবেশ ফি দিতে হবে। এক্ষেত্রে আসার আগে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইর্কোপার্ক কর্তৃপক্ষকে অবগত করতে হবে।কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এদিকে চন্দ্রনাথ পাহাড় ও ইকোপার্কের বন কর্মকর্তা রেঞ্জার মো. একরামুল হক জানায়, সীতাকুণ্ড চন্দ্রনাথ ধাম ও ইকোপার্ক এন্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন সীতাকুণ্ডের সৌন্দর্যকে আরো প্রসারিত করেছে। তবে সীতাকুণ্ডের ইকোপার্কে দেশ বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষন করতে হলে এর ব্যাপক উন্নয়নের প্রয়োজন। সব মিলিয়ে পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব কিংবা আত্মীয়-স্বজন নিয়ে যে কোন সময় ঘুরে বেড়িয়ে সীতাকুণ্ডের ইকোপার্কের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।- ট্যাগ:
- বাংলাদেশ
- বোটানিক্যাল গার্ডেন
- চট্রগ্রাম