ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের নিরন্তর গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে বাংলাদেশের রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্য। ঐতিহ্য ও পুরাকীর্তির লীলাভূমি বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রাচীনত্বের তুলনায় ধামরাই উপজেলার ইতিহাস তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে নাও হতে পারে। বিশেষ করে বংশী, ধলেশ্বরী, রাঙামাটি অববাহিকার নতুন ভূমিরূপের ধামরাইতে হাজার বছর পূর্বে গড়ে ওঠা পাথর যুগের সংস্কৃতি বা তাম্রপ্রস্তর সংস্কৃতির অস্তিত্ব কল্পনা করাটাও অবাস্তব। তবে ঐতিহাসিক সময় থেকে বিচার করার হলে ধামরাই উপজেলার ক্ষেত্রেও একটি সমৃদ্ধ ইতিহাসের দেখা মেলে যা অনেকটাই বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ও তার আশেপাশের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। বিশেষ করে প্রাক-মোগল ও মোগল যুগের পর থেকে এই অঞ্চলে একটি সমৃদ্ধ মানব বসতি গড়ে উঠেছিল এমন কথা অনেক ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেছেন। তারপর ঔপনিবেশিক সময়কালে নীল চাষ ও জমিদারি কেন্দ্রিক অর্থনীতির বিকাশ ঘটেছিল এই অঞ্চলে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এই অঞ্চলের বীর সেনানীরা। এই সকল দিক থেকে বিবেচনা করতে গেলে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে ধামরাই উপজেলা।

ঢাকা জেলার ২৬৬ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ধামরাই উপজেলা ইতিহাস-প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যে যথেষ্ট সমৃদ্ধ। এখানকার বেশ কিছু প্রত্ন-ইমারতসহ নানা নিদর্শন কালের ধ্বংসলীলা উপেক্ষা করে এখনও জরাজীর্ণ অবস্থায় টিকে আছে। এর মধ্যে মঠ, মন্দির, মসজিদ ও সমাধি, নীলকুঠি এবং আবাসিক ভবন বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এর কিছু কিছু আধুনিক কালে সংস্কার করা হলেও অনেকগুলোই বহু আগে পরিত্যক্ত হয়ে অরক্ষিত অবস্থায় মানব বসতি সম্প্রসারণ ও কৃষিজমি বিস্তারের ফলে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছে। আর মসজিদ-মন্দিরগুলো বহুবার সংস্কার করার ফলে এর আদিরূপ হারিয়ে ফেলেছে। তবে এগুলো এখনও ব্যবহৃত হওয়ায় কোনোরকমে টিকে আছে। অনেক অঞ্চলেই পুরানো মসজিদগুলোকে ভাঙ্গে বানানো হচ্ছে আকারে বড় নতুন স্থান নামাজের জন্য। অন্যদিকে আকাশচুম্বী মন্দির ও মঠগুলো গাঠনিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল হওয়াতে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। ফলে আস্তে আস্তে হারিয়ে যায় ইতিহাসের অমূল্য স্বাক্ষী এই সব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো।
ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গেলে পাওয়া যায় ঔপনিবেশিক বাংলায় স্থাপত্য, বাণিজ্য, শিল্পচেতনায় যে এলাকাগুলো সমৃদ্ধি লাভ করেছিল এর মধ্যে ঢাকার ধামরাই উপজেলা অন্যতম। ধামরাই উপজেলার অনেক গবেষক নানা বিষয় নিয়ে গবেষণা করলেও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও স্থাপত্য নিয়ে গবেষণা হয়েছে খুব কম। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে অধ্যাপক অসিত বরণ পাল দীর্ঘদিন থেকে এই অঞ্চলের উপর গবেষণা করে চলেছেন। অন্যদিকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ৩২ তম ব্যাচের ২০০৬-২০০৭ শিক্ষাবর্ষের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা তিনটি গ্র“পে বিভক্ত হয়ে ২৫.০৪.০৯ থেকে ০২.০৫.০৯ ইং পর্যন্ত এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান পরিচালনা করে। তারা উপজেলার ধামরাই সদর, রোয়াইল, সোমভাগ, নান্নার-সুয়াপুর, কুল্লা এই পাঁচটি ইউনিয়নের উপর মাঠকর্ম সম্পন্ন করে। ধামরাই উপজেলার ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের গাঠনিক ও ঐতিহাসিক দিক নিয়ে তাদের প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যালোচনা এই অঞ্চলের ইতিহাসকে নতুন করে লিখতে বাধ্য করে। তাদের পরিশ্রমী ও তথ্যবহুল প্রতিবেদনে এই ছোট্ট পরিসরের উপজেলাটির ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে অবগত হন বাংলাদেশের ইতিহাসবিদগণ।
সাম্প্রতিক কালের ব্যাখ্যানুবাদী প্রত্নতত্ত্ব চর্চার ক্ষেত্রে যেমন একটি নিদর্শনের বহু অর্থকে অধিক গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে হারিয়ে যাওয়া অতীতের কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। তাই অনেকগুলো ব্যাখ্যাকে পাশাপাশি উপস্থাপন করে অপেক্ষাকৃত সত্য জানার চেষ্টা করা হয়। তাই ধামরাইয়ের এই মাঠকর্মে একটি নিদর্শন সম্পর্কে সবার মত নেয়ার প্রচেষ্টা লক্ষ করা গেছে। উদাহরণ হিসেবে হাজি বাড়ির পুকুরে অসংখ্য মৃৎপাত্র আবিষ্কার এবারের মাঠকর্মকে নতুন মাত্রা দান করে। অবাক করার মতো বিষয় ছিলো এই মৃৎপাত্র আবিষ্কার করার পরে ফিল্ড অফিসার খোকন ভাই হাস্যরস আনতে বলেই বসেন এগুলো সব নব্যপ্রস্তর যুগের মৃৎপাত্র। পরে স্যার এক একটি মৃৎপাত্র সংগ্রহ করার পদ্ধতি দেখিয়ে দিচ্ছিলেন। আমরাও নিজেদের মধ্যে যতদূর পারি আলোচনা করে মাঠকর্ম এগিয়ে নিয়েছিলাম। একজন বন্ধু বিরক্তি ভরে বলেই বসে ধুর এখানে বেশ কিছু খেজুর গাছ আছে, কে হয়তো রসের হাড়ি এখানে আছাড় দিয়ে ভেঙেছিলো তাই এতো মৃৎপাত্র এখানে। কিন্তু আস্তে আস্তে সবার ভুল ধারণাগুলো বদলে যায়। আমরা বুঝতে পারি সেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অতীত নিদর্শন থাকলেও থাকতে পারে যার জন্য গবেষণা হওয়াটা জরুরী।
প্রতিদিন মাঠকর্ম শেষ করে দ্রুততার সাথে ক্যাম্পে ফিরে যেতো হতো। এখানেও কঠোর নিয়ম মেনে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার পাশপাশি ভোরের শিশিরে রোদ ঝলমল করতে শুরু হওয়ার মধ্যেই মাঠে চলে যেতে হতো। যখন ঘুম ভাঙতো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভোরের আলো ফোটার সুযোগ পায়নি। তবুও এই নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে থেকেও প্রত্নতত্ত্ব বিষয়টির প্রতি নির্মল ভালোবাসায় প্রত্যেকের মনে এক ধরণের নতুন কিছু আবিষ্কার বা সৃষ্টি সুখের উল্লাসে উদ্বেলিত হওয়ার আনন্দ কাজ করতে দেখা গেছে। বিশেষ করে ধামরাই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে খুবই কাছে অবস্থিত হওয়ায় আমাদের সেখানে যাওয়ার জন্য ক্যাম্পাস থেকেই রওয়ানা হতে হতো। বন্ধু-বান্ধবীরা সবাই একসাথে নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত হতে হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সপোর্টে। মাঠকর্মে অংশ নেয়ার তাড়ার পাশাপাশি এই সময় একটি বিষয় দৃষ্টিগোচর হয়েছে তা হচ্ছে সবার মনে ছিলো একটি বিষাদের ছায়া। দীর্ঘ পাঁচ বছরের শিক্ষাজীবন শেষ করে চলে যেতে হবে সবাইকে এই গ্লানি ঝরে পড়ছিলো সবার চোখে মুখে। তবুও মাঠকর্মের পেশাদারিত্ব থেকে দূরে সরে আসেনি কেউ। তাই মাঠকর্মে গিয়ে দেখা গেছে তানিম-রুমন-মাসউদ ঠিকই বরাবরের মতোই হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে মাটি কাটছে। আসুরিক ধৈর্য্যে কেউ ড্রয়িং করছে, কাঠফাটা রোদে মাইলের পর হেঁটে চলেছি আমি, নেছার, আব্বাস। খুঁজে ফিরছি কোনো প্রাচীন ঢিবি নজরে আসে কিনা। এক হাঁটু ধানক্ষেতের কাদা জল মাড়িয়ে ঢিবি খুঁজতে যেতে যেমন আমরা পিছপা হয়নি তেমনি রোদের উত্তাপ সিয়ামকে আটকে রাখতে পারেনি জি.পি.এস রিডিং নেয়া থেকে।
অতীত মানুষের রেখে যাওয়া বস্তুগত সংস্কৃতিতে একজন প্রত্নতাত্ত্বিক খুঁজে ফেরেন অতীতের আলেখ্য। এখানে শেষ বলে কিছু নেই। স্বল্প সময়ে পরিচালিত মাঠকর্মে ৩২ তম ব্যাচ কেবলমাত্র স্থাপত্যকেই গুরুত্ব দিয়ে তাঁদের মাঠকর্ম পরিচালনা করেছিলেন। তখন সময় স্বল্পতায় অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ঢিবি সম্পর্কিত গবেষণা বাদ পড়ে যায়। তাই এবারের ৩৭ তম ব্যাচের মাঠকর্মে এই ঢিবিগুলোর প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়। ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও মাঠ পর্যায়ের জরিপে একের পর এক শনাক্ত করা হয় বেশ কয়েকটি পূর্ব আবিষ্কৃত ঢিবি। কয়েকটি নতুন ঢিবি সম্পর্কে জানার সুযোগ হয় এবারে জরিপ ও অনুসন্ধানে। বদর জমাদ্দারের ভিটা ও সাত সতীনের ভিটায় খনন করে এর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করা হয়। অন্যদিকে হাজি বাড়ির পুকুরের সেকশন থেকে আবিষ্কার করা হয় একটি সমৃদ্ধ মৃৎপাত্রের ক্লাস্টার।
এখানে রিম, বেস, নেক, বডির ভগ্নাংশ থেকে শুরু করে পূর্ণাঙ্গ মৃৎপাত্র পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এগুলোর বিশ্লেষণ করে ধামরাইয়ের অতীত নিয়ে যে নতুন আলেখ্য দাঁড় করানো সম্ভব হবে তা এদেশের আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষণার ক্ষেত্রে হবে একটি মাইলফলক। একটি কোর্সের পরিপূরক হওয়াতে এই প্রতিবেদনটি অনেক ক্ষেত্রে আংশিক ও নির্দেশিত কাঠামো অনুসরণ করে প্রস্তুত করা হয়েছে। তবুও গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য থেকে এখানে কোনোরূপ বিচ্যুতি ঘটেনি একথা নিদ্বিধায় বলা যায়। প্রিয় পাঠক ঢাকার অদূরে অবস্থিত এই এলাকাটি চাইলে আপনিও বেড়িয়ে আসতে পারেন সপরিবারে।