ছবি সংগৃহীত

অ্যাডামের প্রথম স্ত্রী লিলিথঃ সম-অধিকার চাওয়ায় স্বর্গ থেকে বিতাড়িত!

প্রিয় লাইফ
লেখক
প্রকাশিত: ২৭ নভেম্বর ২০১৩, ১৫:৪৯
আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০১৩, ১৫:৪৯

পৌরাণিক কাহিনী গল্পই। তাই, আল কোরআনে বর্ণিত আদম এবং হাওয়ার সাথে এখানের অ্যাডাম এবং ইভ-এর কোন সম্পর্ক নেই। বেশ, অ্যাডাম এবং ইভ প্রথম পুরুষ ও নারী, এমনটা আমরা জানি। কিন্তু এটা কি জানি, অ্যাডাম এবং ইভ একই সাথে সৃষ্টি হয়েছিল নাকি আগে ও পরে সৃষ্টি হয়েছিল? দেখা যাক, এ ব্যাপারে বাইবেল কী বলে। বাইবেল অনুসারে, ঈশ্বর ৭ দিনের মধ্যে স্বর্গ ও পৃথিবীর বিভিন্ন জিনিস সৃষ্টি করেন। কিন্তু অবাক করা হলেও সত্যি যে, অ্যাডাম ও ইভ নিয়ে আমাদের উপরের প্রশ্নের দুই ধরনের উত্তর পাওয়া যায়, জেনেসিস ১ ও ২ থেকে। বাইবেলের জেনেসিস ১:২৬-২৭ অনুসারে, ঈশ্বর নিজের রূপে মানব সম্প্রদায় সৃষ্টি করলেন। পুরুষ এবং নারী একই সাথে। যেহেতু একই সাথে তাই এটা অনুমান করতে দোষের কিছু নেই যে, তাদের সৃষ্টির উপাদানও একই ছিল। কিন্তু জেনেসিস ২:৭-২৫-এ এই একই ঘটনার ভিন্ন রূপ দেখা যায়। জেনেসিস ২:৭-২৫ অনুসারে, অ্যাডাম আগে এবং ইভকে পরে সৃষ্টি করা হয়েছিল। আরও মজার ব্যাপার জেনেসিস ২ বলছে, তাদের সৃষ্টির উপাদান একই ছিল না। ইভকে সৃষ্টি করা হয়েছিল অ্যাডামের পাঁজরের হাড় থেকে। কেউ যদি জেনেসিস ২ পড়ে থাকেন তাহলে ব্যাপারটি স্পষ্ট হবে যে, অ্যাডাম ও ইভের ঘটনা বর্ণনায় এমন একটা ভাব আছে যে, আগে কিছু যেন একটা ঘটেছিল যার উল্লেখ নেই জেনেসিস ২ তে। এর আভাস আছে অ্যাডামের অনুভূতিতেও। ইভকে পেয়ে রীতিমতো উল্লাস করেছিল অ্যাডাম। কাউকে পরাজিত করার আনন্দও যেন ছিল সেই উল্লাসে। ইভকে পেয়ে অ্যাডামের অনুভূতি ছিল, আমি ইহাকে পাইলাম, আমি ইহাকে পাইলাম-এর মতো। অ্যাডামের অনুভূতি ছিল এমন, এবং এখন এই হাড় আমারই এই মাংস আমারই তাকে “নারী” বলা হবে, কারন তাকে পুরুষ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। “এখন” শব্দটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।“এখন” কিছু হলে পূর্বে নিশ্চয় কিছু ঘটেছিল! আসলে কি ঘটেছিল এটা আর জানা যায় না বাইবেল থেকে। সমস্যা নেই। দেখা যাক, ইহুদি ধর্ম কী বলে। জেনেসিস ১ ও ২ এর মধ্যেকার ভিন্নতা দূর করতে প্রাচীন রাব্বিরা দুটি পথ বেছে নিয়েছিল। তাদের প্রথম অনুমান, প্রথমে যে সৃষ্টি হয়েছিল সে ছিল অ্যাডামের প্রথম স্ত্রী। তার পাখা ছিল। তাকে অ্যাডাম পছন্দ করেনি এবং ঈশ্বর তাঁর পরিবর্তে ইভকে সৃষ্টি করেছিল তারই পাঁজর হতে। তাদের দ্বিতীয় অনুমান, প্রথম সৃষ্টিটি ছিল উভয় লিঙ্গের। নারী এবং পুরুষ উভয়ই একই সাথে ছিল। এর পর তারা পৃথক হয়ে যায় (জেনেসিস রাব্বা ৮:১, লেভিটিকাস রাব্বা ১৪ : ১)। সব কিছু কেমন যেন জট পাকিয়ে গেলো। নিশ্চয়ই কেউ কেউ ধাক্কা খেলেন প্রাচীন রাব্বাদের প্রথম ব্যাখ্যা শুনে। অ্যাডামের প্রথম স্ত্রী ইভ নয়, অন্য কেউ! আবির্ভাব হল নতুন একটা তথ্যের, অ্যাডামের প্রথম স্ত্রীও তবে ছিল! বাইবেল এবং তিলমুদের তথ্যের অপূর্ণতা থেকে পৌরাণিক কাহিনীতে সৃষ্টি হয়েছে লিলিথের। যেমন ব্যাবিলন তিলমুদে লিলিথ-এর কথা ৪ বার এলেও একথা কোথাও উল্লেখ নেই যে, অ্যাডামের প্রথম স্ত্রীর নাম ছিল লিলিথ। তাকে সেখানে ডেমন বা শয়তান/দানব রূপেই দেখতে পাওয়া যায়। লিলিথ কাহিনীর অসংলগ্নতা মিথ দূর করেছে সুন্দরভাবে। ব্যাবিলন মিথ বলে, লিলিথ ও অ্যাডাম একই মাটি থেকে সৃষ্টি হয়েছিল। আর এ কারনেই লিলিথ সম-অধিকার চেয়েছিল। সঙ্গমের সময় লিলিথ কিছুতেই নিচে থাকতে চায়নি। কারন, তারা একই উপাদান থেকে সৃষ্টি হয়েছে। অ্যাডাম বলেছিল, সে-ই শ্রেষ্ঠ তাই সে উপরে থাকবে। আর এতেই ঝগড়া চলতে থাকে অ্যাডাম ও লিলিথের। স্বর্গ ত্যাগ করে লিলিথ। ঈশ্বর তখন এঞ্জেলদের বলে, লিলিথকে ফিরিয়ে আনতে। নইলে প্রতিদিন ১০০ সন্তান মেরে ফেলার অনুমতি দিতে হবে লিলিথকে।

লিলিথের নাম পাওয়া যায়, ৭০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে লিখিত বেন সিরাখের পাণ্ডুলিপিতেও। এই পাণ্ডুলিপির সাথে রাজা নেবুচাদনেজারের নামও জড়িত। রাজা নেবুচাদনেজারের ছেলে অসুস্থ হলে বেন সিরাখকে তিনি সুস্থ করতে বললেন। বেন সিরাখ তখন তিনজন এঞ্জেলের নাম লিখে একটা তাবিজ তৈরি করলেন নেবুচাদনেজারের সন্তানের জন্য। নেবুচাদনেজার এর কারন জানতে চাইলে বেন সিরাখ বলেন, অ্যাডামের প্রথম স্ত্রী লিলিথ স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হবার পর সে প্রতিদিন ১০০ সন্তান নষ্টের অনুমতি পায়। সাথে এই ক্ষমতাও পায়, ছেলে নবজাতককে ৮ দিন এবং মেয়ে নবজাতককে ২০ দিন রোগে আক্রান্ত করার। কিন্তু ঈশ্বরের নির্দেশে ঐ তিনজন এঞ্জেল তাকে ফিরিয়ে আনতে গেলে লিলিথ প্রতিজ্ঞা করে, যখন তাদের নাম কোন মাদুলিতে দেখবে তখন সে আর এমন করবে না। না, এঞ্জেলদের কথায় স্বর্গে আর ফেরত যায়নি লিলিথ। খুব বোধহয় অভিমান হয়েছিল তার। এই যে স্বর্গ থেকে লিলিথের বিতারন, অমঙ্গল করার শক্তি প্রাপ্তি, এর পর কী হয় লিলিথের। লিলিথ কাহিনীর শেষটুকু জানতেও আমাদের ভর করতে হবে উপকথার উপর। যদিও ব্যাবিলন তিলমুদে লিলিথ-এর কথা ৪ বার এসেছে। কিন্তু, এসেছে অন্যভাবে। যেমন, বিটি সাব্বাত ১৫১ বি-তে আছে, কোন পুরুষের বাড়িতে একা থাকা উচিৎ নয়, যেই একা থাকবে তারই উপর ভর করবে লিলিথ। এখানকার লিলিথের চরিত্রের সাথে সম্পূর্ণ মিল পাওয়া যায় উপকথার সাকুবাসের। জোহার এবং বেন সিরাখের লেখায় উল্লেখ পাওয়া যায় যে, সাকুবাস এবং লিলিথ আসলে একই চরিত্র। সাকুবাস হল নারী অপদেবতা বা প্রেতযোনি যে রাতে একাকী পুরুষের উপর ভর করে। উদ্দেশ্য যৌন মিলন। বিটি সাব্বাত ১৫১ বি-তে উল্লেখিত লিলিথ আর উপকথার সাকুবাসের মধ্যে আসলেই মিল আশ্চর্যজনক! কাকতালীয় বলতে পারেন কেউ কেউ। কাকতালীয় বললে লিলিথ কাহিনীর শেষ অংশটুকু থেকে যায় আবার অমীমাংসিত! লিলিথের শেষ অংশটুকুও দারুণ। স্বর্গ থেকে বিতাড়িত লিলিথ এখন একা, অতৃপ্ত। রাতের আঁধারে অবিবাহিত ঘুমন্ত ছেলেদের সাথে মিলিত হয়ে যাচ্ছে লিলিথ, শতাব্দীর পর শতাব্দী। অতৃপ্ত লিলিথ নিজের যৌন ক্ষুধা মিটিয়ে যাচ্ছে এভাবেই। আর কথা মত, প্রতিদিন ১০০ শিশু ডেমনের মৃত্যু ঘটছে এই যৌথ ক্রিয়ায়। অনেকেই বলেন, এ কারনেই নাকি ছেলেদের রাতে স্বপ্ন স্খলন বেশি হয়, যেখানে মেয়েদের তেমন হয়না! তাহলে, লিলিথের অস্তিত্ব সত্যিই আছে নাকি? যাহোক, আধুনিককালে অনেকে লিলিথকে নারীবাদের অগ্রপথিক হিসেবে দেখেন। স্বৈরশাসন থেকে স্বনির্ভরতা ও স্ব��ধীনতার জন্য যে কিনা ইডেন গার্ডেনের সুরক্ষিত জীবন ত্যাগ করে বরন করে নিয়েছিল একাকীত্ব!