পূর্ণ শক্তির সার্ক আগের চেয়েও জরুরি
দক্ষিণ এশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল, সবচেয়ে তরুণ, সবচেয়ে সম্ভাবনাময়, অথচ সবচেয়ে কম সংযুক্ত অঞ্চলগুলোর একটি। এখানে ইতিহাস আছে, সভ্যতা আছে, নদী আছে, পাহাড় আছে, সমুদ্র আছে, শ্রম আছে, বাজার আছে, মেধা আছে; কিন্তু নেই পর্যাপ্ত আঞ্চলিক আস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ, নীতিগত সমন্বয় এবং সম্মিলিত কূটনৈতিক কণ্ঠ।
এ অভাবের নামই আজ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক দুর্বলতা। সার্ক এ দুর্বলতাকে শক্তিতে রূপান্তর করার সবচেয়ে স্বাভাবিক, সবচেয়ে ঐতিহাসিক এবং সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মঞ্চ হতে পারত; কিন্তু দীর্ঘদিন সার্ক প্রায় নিস্তব্ধ, যেন একটি ঘর আছে, দরজা আছে, টেবিল আছে, পতাকা আছে, কিন্তু কথোপকথন নেই।
আজকের বাস্তবতায় সার্ককে পূর্ণ শক্তিতে সক্রিয় করা কোনো কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, এটি একটি ভূরাজনৈতিক প্রয়োজন, অর্থনৈতিক জরুরি কাজ এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্ন। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি রাষ্ট্র তার নিজস্ব সার্বভৌমত্ব, নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, নিজস্ব রাজনৈতিক চরিত্র, নিজস্ব কূটনৈতিক অগ্রাধিকার অক্ষুণ্ন রেখেই আঞ্চলিক সহযোগিতায় প্রবেশ করতে পারে।
সার্ক মানে জাতীয় পরিচয় বিলীন করা নয়; সার্ক মানে জাতীয় শক্তিগুলোকে আঞ্চলিক সক্ষমতায় রূপান্তর করা। এক বাজার মানে এক জাতি নয়, এক কণ্ঠ মানে এক মত নয়, এক অঞ্চল মানে, একরূপতা নয়। বরং একটি পরিণত আঞ্চলিকতা হলো-বৈচিত্র্যকে অস্বীকার না করে তাকে সমন্বয়ের শক্তিতে পরিণত করা।
আঞ্চলিকতা বনাম সার্বভৌমত্ব : ভুল দ্বন্দ্ব : সার্ক নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো-আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়লে নাকি জাতীয় সার্বভৌমত্ব কমে যায়। বাস্তবে তা নয়। আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কে সার্বভৌমত্বের অর্থ আর শুধু সীমান্ত পাহারা দেওয়া নয়; সার্বভৌমত্বের অর্থ হলো, নিজের জনগণের জন্য খাদ্য, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, বাজার, নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার সক্ষমতা। কোনো রাষ্ট্র একা এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে না। তাই সহযোগিতা দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং কৌশলগত পরিপক্বতার পরিচয়।
এক বাজার : দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো-এখানে বিপুল জনসংখ্যা, বিশাল বাজার, দ্রুতবর্ধনশীল মধ্যবিত্ত, সস্তা শ্রম, কৃষি ও শিল্পের সম্ভাবনা আছে; কিন্তু দেশগুলো পরস্পরের সঙ্গে যথেষ্ট বাণিজ্য করে না। অনেক ক্ষেত্রে পাশের দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করার চেয়ে দূরের দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করা সহজ।
পণ্য সীমান্তে আটকে থাকে, কাস্টমস জটিল, ভিসা কঠিন, রাজনৈতিক অবিশ্বাস বড়, আর পরিবহণ সংযোগ দুর্বল। ফলে অঞ্চলটি সম্ভাবনার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন করে, কম রপ্তানি করে, কম বিনিয়োগ আকর্ষণ করে এবং কম কর্মসংস্থান তৈরি করে।
সার্ককে পূর্ণ শক্তিতে সক্রিয় করার প্রথম ধাপ হওয়া উচিত একটি বাস্তববাদী আঞ্চলিক অর্থনৈতিক চুক্তি, যেখানে অগ্রাধিকার পাবে শুল্ক সহজীকরণ, সীমান্ত অবকাঠামো, ডিজিটাল কাস্টমস, আঞ্চলিক পেমেন্ট ব্যবস্থা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার বাজার প্রবেশ, নারী উদ্যোক্তাদের আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম, কৃষিপণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল, এবং ই-কমার্সের সীমান্ত পারাপার নিয়ম। এক বাজার মানে সবাই একই মুদ্রা ব্যবহার করবে বা একই অর্থনীতি হয়ে যাবে-তা নয়।
এর অর্থ হলো দক্ষিণ এশিয়ার উৎপাদক, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, ছাত্র, গবেষক, পর্যটক ও উদ্ভাবকের জন্য আঞ্চলিক দরজা খুলে দেওয়া। বাংলাদেশের পোশাক, ভারতের ওষুধ ও প্রযুক্তি, শ্রীলংকার সেবা অর্থনীতি, নেপালের জলবিদ্যুৎ, ভুটানের সবুজ শক্তি, মালদ্বীপের পর্যটন, পাকিস্তানের কৃষি ও টেক্সটাইল, আফগানিস্তানের ভৌগোলিক সংযোগ-সব মিলিয়ে একটি আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খল তৈরি হতে পারে। এতে কারও দেশ ছোট হয় না; বরং প্রত্যেকে নিজের শক্তিকে বড় বাজারে ব্যবহার করতে পারে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- কূটনৈতিক তৎপরতা
- সার্ক