আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সমস্যার যেন কোনো শেষ নেই। রাজনীতির মঞ্চে কত বাদ্যবাজনা, কত ঘোষণা, কত প্রতিশ্রুতি, কত পালাবদল; অথচ কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতার দেখা নেই। গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, বাজারে স্বস্তি নেই; নিত্যপণ্যের দাম কমারও কোনো দৃশ্যমান সম্ভাবনা নেই। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই, চাঁদাবাজি-দখলদারত্ব-মবতন্ত্রের দৌরাত্ম্যও থামছে না। ফলে নাগরিকের জীবন এখন এক দীর্ঘ রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা, যেন প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে প্রথম প্রশ্নটিই হচ্ছে, আজ আর কী ঘটে! এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার অভিঘাত। পৃথিবীর এক প্রান্তে যুদ্ধ বা সংঘাত শুরু হলেই তার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে আমাদের রান্নাঘরে। ইরান ও ইউক্রেন সংকটের সমাধান-সূত্র না মিলতেই ইয়েমেনের হুতিদের ঘিরে নতুন উত্তেজনা সেই বৈশ্বিক অস্থিরতার পরিধি আরও বাড়িয়েছে।
হ্যাঁ, ছোট্ট এক সশস্ত্র গোষ্ঠী, অথচ আজ গোটা বিশ্বের মাথাব্যথার কারণ। নাম হুতি। যুদ্ধবিধ্বস্ত দরিদ্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইয়েমেন তাদের ঘাঁটি। উত্থানের গল্প যেন রূপকথার মতো। পরনে লুঙ্গি, হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, অথচ বিশ্বের কাছে এক আতঙ্কের নাম হুতি।
ইয়েমেন কোথায়, জিজ্ঞেস করলে অনেকের চোখে মানচিত্র আসে না। আসে যুদ্ধের ছবি। তারপর মনে পড়ে, আরবের একটি দেশ। কিন্তু সমুদ্রের মানচিত্রে সেই ইয়েমেনের পাশে এমন এক দরজা আছে, যার চাবি নিয়ে বড় রাষ্ট্রগুলোরও মাথাব্যথা। দরজাটির নাম বাব আল-মান্দেব। আসলে এটি এমন জলপথ, যেখানে ড্রোন উড়লেই ইউরোপের বন্দরে জাহাজের রুট বদলায়, বিমা কোম্পানি অঙ্ক কষে, জ্বালানি খরচ বাড়ে এবং ঢাকার বাজারে ভূরাজনীতি এসে বলে, ‘এই যে ভাই, আমাকে চিনতে পারছেন?’
এই জলদরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে হুতিরা। তাদের নাম আনসার আল্লাহ, অর্থাৎ ‘আল্লাহর সমর্থক’। বাস্তবে তাদের জন্ম উত্তর ইয়েমেনের জায়দি শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পুনর্জাগরণ আন্দোলন থেকে। নব্বইয়ের দশকে জায়দিদের ওপর বৈষম্যের অভিযোগ, উত্তরাঞ্চলের বঞ্চনা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অবহেলা আন্দোলনটির ভিত তৈরি করে। হুসাইন বিন বদরুদ্দীন হুতি ছিলেন অন্যতম নেতা। ২০০৪ সালে সরকারি বাহিনীর হাতে হুসেইন নিহত হওয়ার পর আন্দোলনটি হুতি নামে আরও পরিচিত হয়ে ওঠে।
পরে নেতৃত্ব নেন হুসেইনের ভাই আবদুলমালিক আল-হুতি। তাঁর নেতৃত্বে পাহাড়ি এলাকার একটি বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী ধীরে ধীরে সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে হুতিদের একাধিক যুদ্ধ হয়। ২০০৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবের সঙ্গেও সংঘর্ষে জড়ায় তারা। আরব বসন্তের সময় ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহকে ক্ষমতা ছাড়ার আন্দোলনে হুতিরা অংশ নেয়। কিন্তু রাজনীতির রাস্তা এখানে সরল ছিল না। পরে তারাই সালেহর সঙ্গে জোট গড়ে। সেই জোটও টেকেনি। ২০১৭ সালে সালেহ হুতিদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে সৌদি-সমর্থিত পক্ষের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করলে হুতিদের হাতেই নিহত হন।
হুতিদের বড় উত্থান ঘটে ২০১৪ সালে। জ্বালানি ভর্তুকি কমানো ও মূল্যবৃদ্ধির ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে তারা শক্তি বাড়ায় এবং রাজধানী সানা দখল করে। প্রেসিডেন্ট আবদ রাব্বু মনসুর হাদি পরে সৌদি আরবে আশ্রয় নেন। এরপর ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে সামরিক জোট হুতিবিরোধী অভিযান শুরু করে। উদ্দেশ্য ছিল তাদের পেছনে সরিয়ে দেওয়া। যুদ্ধের ইতিহাসে ‘দ্রুত সমাধান’ কথাটি যতবার বলা হয়েছে, ইতিহাস সম্ভবত ততবার আড়ালে হেসেছে। ইয়েমেনেও তাই হলো। যুদ্ধ দীর্ঘ হলো, মানবিক বিপর্যয় বাড়ল, আর হুতিরা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠল।
উত্তর ইয়েমেনের জায়দি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে উদ্বেগ এবং সৌদি প্রভাবের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তাদের উত্থানের মাটি তৈরি করেছিল। পরে সেই স্থানীয় ক্ষোভের সঙ্গে ভূরাজনীতি মিশেছে। তবে ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ইরান হুতিদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহায়তা ও সামরিক প্রযুক্তি দিয়েছে। ইরান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। লেবাননের হিজবুল্লাহর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ পাওয়ার কথাও সূত্রে এসেছে। ফলে হুতিদের হাতে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, রাডার, গোয়েন্দা প্রযুক্তি এবং সমুদ্রপথে হামলার সক্ষমতা বেড়েছে। স্থানীয় বিদ্রোহী আন্দোলন তখন আর শুধু স্থানীয় থাকল না। পাহাড় থেকে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে তারা বিশ্ববাণিজ্যকে অস্বস্তিতে ফেলার জায়গা পেল।