বিদেশি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ থেকে সরে যাচ্ছে কেন
একসময় বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আন্তর্জাতিক ব্যাংকের উপস্থিতি ছিল পেশাদারি, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত গ্রাহকসেবা ও সুশাসনের প্রতীক। বিশেষ করে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও এইচএসবিসির মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কয়েক প্রজন্মের গ্রাহকের আস্থা ও নির্ভরতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাই স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং বা খুচরা ব্যবসা বিক্রির সিদ্ধান্ত এবং এর আগে এইচএসবিসির রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার ঘোষণা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করেছে—আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো কি বাংলাদেশের বাজারের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে, নাকি আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ের ব্যবসায়িক মডেলেই মৌলিক পরিবর্তন ঘটছে?
প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের বৈশ্বিক ব্যাংকিং কৌশল, স্থানীয় বাজারের প্রতিযোগিতা এবং পরিচালন ব্যয়ের অর্থনীতি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার, রিটেইল ব্যাংকিং থেকে সরে আসা মানেই বাংলাদেশ থেকে পুরোপুরি বিদায় নেওয়া নয়। ব্যক্তিগত গ্রাহকদের আমানত, ক্রেডিট কার্ড, গৃহঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ, অর্থ পরিশোধ সেবা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা রিটেইল ব্যাংকিংয়ের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে করপোরেট ব্যাংকিং, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন, ট্রেজারি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ভিন্ন ব্যবসায়িক ক্ষেত্র। আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো অনেক ক্ষেত্রেই রিটেইল ব্যাংকিংয়ের পরিসর কমিয়ে এসব কার্যক্রমে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি হলো ব্যবসার অর্থনীতি। একটি বহুজাতিক ব্যাংককে শুধু শাখা পরিচালনা কিংবা গ্রাহকসেবার ব্যয় বহন করলেই চলে না। বৈশ্বিক প্রযুক্তি অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা, অর্থ পাচার প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা যাচাই, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মূলধন সংরক্ষণ এবং গ্রুপ পর্যায়ের তদারকির জন্য উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করতে হয়।
এসব ব্যয়ের বড় অংশ গ্রাহকসংখ্যা কমলেও কমে না। ফলে কোনো দেশে ব্যাংকটির গ্রাহক ভিত্তি, আমানত, ঋণ ও লেনদেনের পরিসর পর্যাপ্ত বড় না হলে প্রতিটি গ্রাহকের বিপরীতে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়।
ব্যাংকের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে শুধু মুনাফা অর্জনই বিবেচ্য নয়; বিনিয়োগকৃত মূলধনের বিপরীতে কতটা রিটার্ন পাওয়া যাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি ব্যাংক যদি কোনো দেশে রিটেইল ব্যাংকিং পরিচালনায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে তুলনামূলক কম মুনাফা অর্জন করে, তাহলে একই মূলধন অন্য কোনো বাজারে বা করপোরেট ব্যাংকিংয়ে বিনিয়োগ করে বেশি রিটার্ন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে স্বাভাবিকভাবেই তারা সেই বিকল্প বিবেচনা করবে। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর কাছে মূলধনের দক্ষ ব্যবহার এখন ব্যবসায়িক কৌশলের অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
বাংলাদেশের বাজারে দেশীয় ব্যাংকগুলোর রয়েছে বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক, দীর্ঘদিনের গ্রাহক সম্পর্ক এবং স্থানীয় ব্যবসা ও ভোক্তার চাহিদা সম্পর্কে গভীর ধারণা। পাশাপাশি মোবাইল আর্থিক সেবা, ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসার গ্রাহকসেবার ধরন বদলে দিয়েছে।
একসময় আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট কার্ড, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক লেনদেন ও গ্রাহকসেবার সুবিধা ছিল বড় আকর্ষণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দেশীয় ব্যাংকগুলোও এসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। ফলে বিদেশি ব্যাংকগুলোর একসময়কার বিশেষ সুবিধা অনেকাংশে কমে এসেছে। তবে ডিজিটাল সেবার প্রসার মানেই সব দেশীয় ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানের সেবা দিতে সক্ষম হয়েছে, এমনটি ভাবারও কারণ নেই।
এ ধরনের ব্যবসায়িক পুনর্গঠন শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বব্যাপী বড় ব্যাংকগুলো এখন তাদের মূলধন এমন বাজার ও ব্যবসায় কেন্দ্রীভূত করতে চাইছে, যেখানে তুলনামূলক বেশি মুনাফা এবং বিনিয়োগের বিপরীতে ভালো রিটার্ন পাওয়া সম্ভব। ভারতের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালে সিটি ব্যাংক এনএ তাদের ভারতীয় ভোক্তা ব্যাংকিং ব্যবসা অ্যাক্সিস ব্যাংকের কাছে বিক্রি করে।