উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার গুরুত্ব কি কমতে শুরু করেছে
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল অনেককেই বিস্মিত করেছে। কিন্তু যাঁরা কয়েক বছর ধরে ফলাফল পর্যবেক্ষণ করছেন, তাঁদের কাছে এটা খুব বেশি অপ্রত্যাশিত ছিল না। কারণ, শিক্ষা বোর্ডের নীতির কারণে ফলাফলে যে প্রভাব পড়ে, সেটা শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা আগেও স্বীকার করেছেন।
পাসের হার বেশি দেখানোর জন্য কোনো কোনো বছর ‘সরলভাবে’ খাতা দেখার নির্দেশনার কথাও আমরা শুনেছি। এভাবে পাসের হার হয়তো বেড়েছে, কিন্তু তাতে শিক্ষার মান কতটুকু বেড়েছে, সেই প্রশ্ন থেকে গেছে।
তবে আরেকটা প্রশ্ন নিয়েও ভাবা দরকার—উচ্চমাধ্যমিক স্তরের গুরুত্ব কি কমতে শুরু করেছে? তাই যদি না হবে তো এত শিক্ষার্থী কোথায় গেল? ২০২৪ সালে যারা এসএসসি পাস করেছিল, তারাই এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ২০২৪ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেছিল ১৬ লাখ ৭২ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী। অথচ ২০২৬ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১২ লাখ ৭০ হাজারের মতো শিক্ষার্থী।
এই হিসাবেই অন্তত ৪ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ভর্তি হয়নি কিংবা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। বাস্তবে এই সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি। কারণ, গত বছর ২০২৫ সালে ৫ লাখের বেশি পরীক্ষার্থী এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি; তাদের একটি বড় অংশও এ বছর পরীক্ষা দিয়েছে। তার মানে, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর কাছে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের গুরুত্ব হারিয়েছে।
এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলও নানা কারণে গুরুত্ব হারাতে শুরু করেছে। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রধান বিবেচ্য হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষায় ভালো করার একটা চাপ থাকে। কিন্তু স্নাতক পর্যায়ে ভর্তির ক্ষেত্রে এইচএসসির ফলাফল প্রায় বিবেচিতই হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তির জন্য আলাদা করে পরীক্ষা নেওয়া হয়।
এ কারণে এমনও দেখা যায়, কিছু শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনার পাশাপাশি ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে! এইচএসসির ফলাফল পরবর্তী চাকরির বাজারেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে না। সেখানেও মূলত বহুনির্বাচনী বা লিখিত পরীক্ষা এবং ভাইভার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়, কিংবা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়।
এ বছর যারা এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের জন্য এসব বিষয়ে এক মাসের মধ্যে আবার পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি শিক্ষার্থীদের স্বস্তি দেবে, সন্দেহ নেই। কিন্তু তাদের ফল প্রকাশের জন্য বাড়তি কিছু সময় লেগে যাবে। এর দরুন আরেক সংকট তৈরি হবে। কারণ ইতিমধ্যে মেডিক্যাল, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি গুচ্ছসহ বিভিন্ন ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি পরীক্ষার নির্ধারিত তারিখ পিছিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে। সেটি করা না হলে এই শিক্ষার্থীরা আরেক ধরনের সংকটে পড়বে।
এবারের এইচএসসির ফলাফলকে প্রায় সবাই ‘বিপর্যয়’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। কিন্তু একজন পরীক্ষার্থীর জিপিএ তার মেধার সমতুল—এটা কিসের ভিত্তিতে আমরা বলতে পারব? কারণ, খাতা দেখার ক্ষেত্রে পরীক্ষকদের স্বেচ্ছাচার ও অমনোযোগের নজির আছে। তা ছাড়া সব পরীক্ষকের মূল্যায়নের ধারা এক রকম নয়।
এই সমস্যা কাটানোর জন্য বিষয়ভিত্তিক প্রতিটি প্রশ্নের জন্য আলাদা রুব্রিক্স বা মানদণ্ড নির্ধারণ করা দরকার। এটি করা সম্ভব হলে পরীক্ষকদের খাতা মূল্যায়নের ব্যবধান কমিয়ে আনা সম্ভব। তা ছাড়া প্রতিটি খাতা যদি দুজন পরীক্ষকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়, তবে এইচএসসির ফলাফল আরও বেশি গ্রহণযোগ্য হবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা