পাঠ্যবইয়ে কতবার পরিবর্তনে জাতির সত্য ইতিহাস জানা যায়?

বিডি নিউজ ২৪ পপি দেবী থাপা প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:১০

২০২৭ সালের নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ পাঠ্যবইয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা নিবন্ধ ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নতুন অধ্যায় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছে—এটা নতুন খবর নয়। এরই মধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় সব সংবাদমাধ্যমে খবরটা প্রকাশিত হয়েছে। সেই খবর অনুযায়ী, ইতিহাসে যার যতটুকু অবদান, তা নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে পাঠ্যবইয়ে তুলে ধরতে আরও কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


নির্মোহ থেকে এবং ক্ষমতার প্রভাব মুক্ত হয়ে ইতিহাস রচনা করে নিরপেক্ষ ও সত্য ইতিহাস জাতির কাছে তুলে ধরতে পারা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু সেটা যে পারা যায় না, তা এতকাল পরে আবারও নিরপেক্ষ ও সত্য ইতিহাস জানাবার প্রয়াস থেকেই বোঝা যায়। কোনো জাতি কতটা পথহারা হলে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও তার জন্মের সত্য ইতিহাস খুঁজতে মাঠে নামতে বাধ্য হয় এবং পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন আনতে হয়। এই সত্য খোঁজাখুঁজির ফলে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ একেক রকম করে উপস্থাপিত হচ্ছে।


ইতিহাস যেন বাস করে ক্ষমতার ঘরে। ‘বিজয়ীরাই ইতিহাস লেখে’—এমন একটা কথা নাকি উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন। ঠিক এই বাক্যটি তিনি বলেছিলেন কিনা তা খুঁজে পাওয়া না গেলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যখন যুক্তরাজ্যের নির্বাচনে চার্চিল পরাজিত হলেন, তখন তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন, “ইতিহাস আমার প্রতি সদয় হবে, কারণ এটি লেখার ইচ্ছা আমার নিজেরই আছে।” এই প্রচ্ছন্ন অহংকার আর দূরদর্শিতা থেকেই পরবর্তীকালে তিনি রচনা করেন তার বিখ্যাত বহুখণ্ডের গ্রন্থ ‘দ্য সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার'। মিত্রপক্ষের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে চার্চিল ভালো করেই জানতেন, যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র দিয়ে সাম্রাজ্য জয় করা সম্ভব হলেও, মানবমন জয় করতে হলে ইতিহাসকে নিজের বয়ানে সাজাতে হয়। তাই সেই বিশাল ঐতিহাসিক স্মারকে তিনি নিজের ও মিত্রশক্তির সামরিক সিদ্ধান্ত, কৌশল ও বীরত্বকে উজ্জ্বলতম আলোয় ফুটিয়ে তুলেছিলেন, আর কৌশলগতভাবে আড়াল করেছিলেন তাদের নানাবিধ ভুলত্রুটি ও কূটনৈতিক অন্ধকার দিকগুলো। চার্চিল প্রমাণ করেছিলেন যে বিজয়ী রাষ্ট্রনায়করা শুধু যুদ্ধই জেতেন না, যুদ্ধের পর নিজেদের সুবিধামতো ইতিহাস পুনর্নির্মাণ করে নিজেদের অপরাধ ঢেকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নিজেদের চিরন্তন নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।


সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা গেল, নতুন পাঠ্যপুস্তকে থাকছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। বলা হচ্ছে, যার যতটা অবদান ততটাই থাকবে পাঠ্যপুস্তকে। কিন্তু এই অবদান পরিমাপ হবে কিসের ভিত্তিতে? আশা করি কর্তৃপক্ষ সেক্ষেত্রে সময়, পরিধি, প্রেক্ষাপট, পরিস্থিতি, পরিবেশ, প্রতিকূলতা, অনুকূলতা, দূরদর্শিতা, নেতৃত্বের গভীরতা, স্বাধীনতা সংগ্রামে দৃঢ়চিত্ততা, মুক্তির লক্ষ্যে একনিষ্ঠতা, সঠিক ও সময়মাফিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সত্যিকারের দেশপ্রেমকে বিবেচনায় নিয়ে তাদের অবদান তুলে ধরবেন। নতুন অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করা হলেও জাতির অন্যান্য বীর সন্তানদের অবদান কিভাবে তুলে ধরা হবে তা সুস্পষ্ট নয়। আশা করি শিগগিরই জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এ সংশয় দূর করবে।


একটি দেশের ইতিহাস শুধু আর্কাইভ, গবেষণাগার এবং ইতিহাসবিদের বইয়ে সংরক্ষিত থাকে না। ইতিহাসকে সামনে এগিয়ে নেয় নতুন প্রজন্ম। আর নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের প্রথম ও প্রভাবশালী পরিচয় হয় পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে। যদিও বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাস বদলেছে বারবার। কখনো পুরো শিক্ষাক্রম, কখনো নির্দিষ্ট বই, কখনো একই বইয়ের একটি অধ্যায় বা কয়েকটি অনুচ্ছেদ। কখনো বা পরিবর্তিত হয়েছে একটি ঘটনার কয়েকটি বাক্যও।


স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত প্রথম থেকে দশম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক সংশোধন, পরিমার্জন ও পুনর্লিখন করা হয় খুব দ্রুত। নবজাত রাষ্ট্রের প্রয়োজন, নতুন রাষ্ট্রচেতনা ও আধুনিক ধারণা পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। পরে ১৯৭৮-৭৯ সালে নতুন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে বই প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।


১৯৯১ সালের প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত। ১৯৭১-সংক্রান্ত বিষয় হিসেবে বীরশ্রেষ্ঠদের সংক্ষিপ্ত জীবনীই ছিল প্রধান উপাদানগুলোর একটি। ১৯৯৩ সালে পরিবেশ পরিচিতি (সমাজ) বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ যুক্ত হয়। সেখানে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে এম এ হান্নান ও মেজর জিয়াউর রহমানের নাম ছিল। এই বর্ণনা বহাল ছিল ২০০১ সাল পর্যন্ত। ১৯৯৬ সালে মাধ্যমিক স্তরের বিভিন্ন বইয়ে ১৯৭১-এর ইতিহাস, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক লেখা, কবিতা ও জীবনী নতুনভাবে যুক্ত করা হয়।


২০০১ সালে সরকার পরিবর্তনের পর সেই বর্ণনায় আবার বড় পরিবর্তন আসে। ৭ই মার্চের ভাষণ এবং বঙ্গবন্ধুর নামের কিছু উল্লেখ বাদ দেওয়া হয়। পরিবেশ পরিচিতি (সমাজ) বইয়ে আগের এম এ হান্নান ও মেজর জিয়া সংক্রান্ত বর্ণনা পরিবর্তন করে এম এ হান্নানের নাম এবং ‘বঙ্গবন্ধুর পক্ষে’ কথাটি বাদ দেওয়া হয়; ঘোষণার তারিখও ২৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ করা হয়। ফলে একই ঐতিহাসিক ঘটনা পাঠ্যবইয়ের ভাষায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে কীভাবে বদলেছে, এটা তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও