একটি জেলা শহরের সংস্কৃতিচর্চার ইতিবৃত্ত
সম্প্রতি উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার সিরাজগঞ্জ গিয়েছিলাম। প্রমত্তা যমুনার পারে এই শহরটির রয়েছে দীর্ঘ ভাঙাগড়ার ইতিহাস। আজ থেকে ৩৯ বছর আগে প্রথম এই শহরে যাওয়ার কথা বারবার মনে পড়ছে। মনে মনে হিসাব করে দেখলাম, দেশে ও বিদেশে যেখানেই গিয়েছি, তার প্রধান কারণ একটাই ছিল, সেটা হলো শিল্পকলার প্রেরণা, নাটক। পটভূমিটা একটু বলা দরকার, তখন আমাদের নাটক ‘ওরা কদম আলী’র মঞ্চায়ন চলছে। শুধু আমাদের নাট্যদলে নয়, সারা দেশেই নাটকটি অভিনীত হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের মিলনায়তনে প্রচুর দর্শকের সামনে নাটকটি অভিনীত হওয়ার পর গ্রিনরুমে মেকআপ তুলছি, সে সময় এক সহকর্মী এসে জানাল—একজন তরুণ আপনার সাক্ষাৎপ্রার্থী; দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। তখন বয়স কম, তিরিশও হয়নি। মানুষের প্রতি কৌতূহল অসীম। দ্রুত মেকআপ তুলে বাইরে বেরিয়ে আসি। দেখতে পাই, সত্যিই এক তরুণ, চোখ দুটো সপ্রতিভ জ্বলজ্বল করছে। মনে হলো কলেজের ছাত্র। সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই পরিচয়টি দিল—সে সিরাজগঞ্জের ছেলে। এই নাটকটি তাদের সিরাজগঞ্জে মঞ্চায়ন করার নিমন্ত্রণ করল। আর সেটা সামনে ঈদের পরের দিন করতে হবে। আমি তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেলাম। কারণ, ঈদের সময় আমি আমার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলে প্রতিবছর যাই। কাজেই ঈদের পরদিন সিরাজগঞ্জ যেতে কোনো অসুবিধা হবে না। বাসে ভূঞাপুর গিয়ে যমুনা পেরিয়েই সিরাজগঞ্জ। ছেলেটির কথাবার্তা বেশ আন্তরিক এবং আচরণও অনেকটা শৈল্পিক। ছেলেটিকে নিয়ে গ্রিনরুমে এলাম এবং তার ইচ্ছার কথা দলের সবাইকে জানালাম। অনেকেই উৎসাহিত হলো এবং যথারীতি তার নাম-ঠিকানা রেখে দিলাম। ছেলেটির নাম, হারুনুর রশীদ। একটা টেলিফোন নম্বরও রেখে দেওয়া হলো। আমাদের মধ্যে এক-দুজন ছাড়া কারও বাড়িতে তখন টেলিফোন নেই। আজিজুল হাকিমের টেলিফোন নম্বরটা দিয়ে দেওয়া হলো। ঈদের পরদিন সকালেই ঢাকা থেকে আমার সহকর্মীরা টাঙ্গাইল গিয়ে হাজির হলো এবং সিরাজগঞ্জের পথে আমরা রওনা দিলাম দুপুরের পরে।
একটা শ্যালোইঞ্জিনের নৌকায় বিপুল ঢেউ অতিক্রম করে সিরাজগঞ্জ ঘাটে গিয়ে পৌঁছালাম। সেখানে হারুন এবং তরুণ সম্প্রদায়ের সদস্যরা উপস্থিত ছিল। আমাদের নিয়ে গেল ভাসানী মিলনায়তনে। মোটামুটি মিলনায়তনটি বড় পরিসরের। মঞ্চ নির্মাণ হয়ে গেছে, মেকআপের কাজ চলছে। আমাদেরকে চা-শিঙাড়া খাইয়ে একটা ঘরে বসিয়ে রাখা হলো। যথাসময়ে নাটক শুরু হলো। নাটক শেষ হওয়ার পর মনে হলো রাত একটু গভীর হয়েছে। কারণ, মফস্বল শহরের রাত একটু গভীরই হয়। সেই গভীর রাতে রাজনৈতিক এবং সংস্কৃতিকর্মী আব্দুর রউফ পাতা নিয়ে গেল তার এক আত্মীয়র বাড়িতে। সেখানে ঈদের রান্না করা প্রচুর খাবার ছিল। তাও আবার সেটা ছিল কোরবানির ঈদ। ভদ্রমহিলা খুব গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। নাটক নিয়ে প্রথমেই তিনি মুখ খুললেন। নাটকের প্রদর্শনীর পর দর্শকের প্রচুর উচ্ছ্বাস এবং ভালো লাগার অভিব্যক্তির পর হঠাৎ একটা ছন্দপতন হলো ওই ভদ্রমহিলার কথায়। তিনি বললেন, ‘নিম্নজাতের মানুষ অথবা ম্লেচ্ছদেরকে নিয়ে কোনো শিল্পের কাজ হয় না।’ আমরা তখন সবাই আসন্ন বিপ্লবের গরম হাওয়ায় উদ্দীপ্ত। একটা ঝগড়াই শুরু হয়ে গেল। ইতিমধ্যে টেবিলে খাবার দেওয়া হয়েছে। আমরা সবাই ক্ষুধার্ত। তাই তর্ক-বিতর্কটা স্থগিত হয়ে গেল। পরদিন সকালে আমরা অচেনা আশ্রয় থেকে শহরটা দেখতে বেরিয়েছি। তখন কলেজে পড়া তরুণেরা ছড়া এবং কবিতার আন্দোলন করছে। একটি জনপ্রিয় ছড়ার কথা মনে আছে এখন। ‘নিয়ন বাতির তলে ক্ষুধার আগুন জ্বলে’।
তারপর একটি অনন্য সাধারণ পাঠাগারের খোঁজ পেলাম। নাম ‘ব্যক্তিগত পাঠাগার’। এ পাঠাগারের উদ্যোক্তা হচ্ছেন এম এ বারী। অসংখ্য বই এবং বইয়ের পাশে ছোট্ট একটা টেবিল নিয়ে বসেন এম এ বারী। খুব শান্ত স্বভাবের এবং তরুণ ছেলেদের পড়া এবং আড্ডার জায়গা হচ্ছে এই পাঠাগার। আমাদের নতুন অভিজ্ঞতা। স্কুল-কলেজের পাঠাগার দেখেছি, সরকারি লাইব্রেরি এবং বিভিন্ন সংগঠনের ছোটখাটো লাইব্রেরি দেখেছি, কিন্তু এতসব বই-পুস্তক নিয়ে ব্যক্তিগত পাঠাগার এর আগে দেখিনি। এর মধ্যেই তরুণ সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং ছোটখাটো কর্মশালাও আমরা করে ফেলেছি। সেই থেকে এই ৩৯ বছরে বহুবার নাটকের দল নিয়ে ওই ভাসানী মিলনায়তনে গিয়েছি, অভিনয় করেছি, কর্মশালা করেছি, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় নানা সভা এবং সেমিনারে অংশ নিয়েছি।
এর মধ্যেই নতুন-পুরোনো মিলিয়ে অনেক সংগঠনের জন্ম হয়েছে। হারুন সিরাজগঞ্জ ছেড়ে ঢাকায় এসেছে, আমাদের দলে যোগ দিয়েছে। তরুণ সম্প্রদায়ের পরিচালক আজাদ সিরাজগঞ্জ ছাড়িয়ে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় নাটকের কাজ করছে। সিরাজগঞ্জ উত্তরবঙ্গের একটি নাট্যকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে সিরাজগঞ্জের নাট্যক্রিয়া এগিয়ে চলেছে।
এবার ৩৯ বছর পর সিরাজগঞ্জে এসে একটা নতুন ক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হলাম। নাট্যলোক দীর্ঘদিন যাবৎ শুধু থিয়েটার করা নয়, থিয়েটারের পৃষ্ঠপোষকতা এবং দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেও একটা যোগাযোগ সৃষ্টি করেছে। এবারে নাট্যলোকের প্রধান মোমিন বাবু তার পৈতৃক গৃহে নানা সংস্কারকাজ করে ৬৫ আসনবিশিষ্ট স্টুডিও থিয়েটার নির্মাণ করেছে। আমাকে এই স্টুডিও থিয়েটারের উদ্বোধক হিসেবে বিরল সম্মানটি দিয়েছে। হয়তো তার কারণ হতে পারে, ১৯৯১ সালে ‘বাংলা থিয়েটার’ নামে একটি স্টুডিও থিয়েটারের আমি সূচনা করেছিলাম। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের একটি ছোট্ট মিলনায়তনে আমরা ‘মানুষ’ নাটকটিও অভিনয় করেছিলাম। তখন আমরা চেষ্টা করেছিলাম, মহিলা সমিতির গাইড হাউস—এইসব মঞ্চের বাইরে ছোট ছোট অভিনয়ের জায়গা তৈরি করা যায় কি না। সেই বাংলা থিয়েটারের কার্যক্রম অনিয়মিতভাবে এখনো চলছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সংস্কৃতি চর্চা