জ্বালানি তেলের আপৎকালীন মজুত গড়ে তোলা জরুরি
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত তীব্রতর হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজার আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ২ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১০০ মার্কিন ডলার অতিক্রম করে যায়। অবশ্য পরবর্তী সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্য কিছুটা হ্রাস পেয়ে ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ ও সংঘাত শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ৬০ থেকে ৬৫ ডলারে ওঠানামা করছিল। গত আগস্টের শুরু থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের গড় মূল্য বেড়েছে ২৫ শতাংশ।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ যদি সহসাই না থামে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলার অতিক্রম করে যেতে পারে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি বাহিনী ইরানের ওপর সর্বাত্মক আক্রমণ শুরু করার পর গত এপ্রিলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ১২৬ ডলারে উন্নীত হয়েছিল।
মার্কিন এবং ইসরাইলি বাহিনী ইরানে আক্রমণ শুরু করার পর তাদের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় হরমুজ প্রণালিকে ইরানের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা। কৌশলগত কারণে হরমুজ প্রণালি ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন বিশ্বের যে পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়, তার অন্তত ২০ শতাংশ বা ২ কোটি ব্যারেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়ে থাকে।
কাজেই হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করা ইরানের জন্য অত্যন্ত জরুরি। আর যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে হরমুজ প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে নিজেদের আধিপত্যে নিয়ে যেতে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ যেভাবে দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে, তাতে কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছে না এ সংঘাত কতদিন চলবে। কাজেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।
উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখা এবং গৃহস্থালির কাজ সম্পন্ন করার জন্য বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলকেই প্রধান ভরসা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কোনো কারণে জ্বালানি তেলের স্বাভাবিক সরবরাহ বিঘ্নিত হলে পুরো উৎপাদন ব্যবস্থা বিপর্যয়ের মুখে এসে দাঁড়ায়। জ্বালানি তেলের গুরুত্ব কতটা তা অনুধাবন করা যায় ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে আরব-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হলে অর্গানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ (ওপেক) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এবং তাদের মিত্র দেশগুলোর ওপর জ্বালানি তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর। এর ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল নিয়ে হাহাকার শুরু হয়।
ওপেকের এ নিষেধাজ্ঞার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৪ গুণ বা ৩০০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। যুদ্ধ শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ছিল ৩ মার্কিন ডলারেরও কম। ১৯৭৪ সালে জানুয়ারি মাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ১২ ডলারে উন্নীত হয়।
আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে একে ‘প্রথম তেল সংকট’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। ওপেকের জ্বালানি তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত এ নিষেধাজ্ঞার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি দেখা দেয় এবং অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। তারপর যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলো আপৎকালীন সংকট মোকাবিলার জন্য অভ্যন্তরীণভাবে জ্বালানি তেলের মজুত গড়ে তোলে। যেসব দেশে তেল উৎপাদিত হয় না, তারা আমদানির মাধ্যমে জ্বালানি তেলের রিজার্ভ গড়ে তোলে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জ্বালানি তেল
- মজুত