জলবায়ু কূটনীতি, ঋণ ও ন্যায়বিচার : বাংলাদেশের করণীয়
জলবায়ু পরিবর্তন কি তার আগের আকর্ষণ হারাচ্ছে? আমার মনে হয়, এই অনুভূতিটি পুরোপুরি ভুল নয়। তবে বিষয়টি একটু সূক্ষ্মভাবে দেখতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা কমে যাচ্ছে—এমনটি বলা ঠিক হবে না। বরং জলবায়ু পরিবর্তন তার নতুনত্ব, বিশেষত্ব এবং রাজনৈতিক আলোচনায় আগের মতো আলাদা জায়গা হারিয়েছে।
২০০৭ থেকে ২০১৫ সালের দিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি ছিল তুলনামূলকভাবে নতুন এবং অত্যন্ত আলোচিত একটি বৈশ্বিক সমস্যা। আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেল (আইপিসিসি)-এর প্রতিবেদনগুলো ব্যাপক গুরুত্ব পেত। কোপেনহেগেন সম্মেলন এবং পরে প্যারিস চুক্তি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি করেছিল। জলবায়ু পরিবর্তন তখন নিজেই একটি স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ক্ষেত্র ছিল।
এখন পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। জলবায়ু পরিবর্তন আর শুধু একটি আলাদা গবেষণার বিষয় নয়। এটি প্রায় সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। কৃষি, অভিবাসন, খাদ্যনিরাপত্তা, পানি, স্বাস্থ্য, নগরায়ণ, স্থানীয় সরকার, দারিদ্র্য, বৈষম্য, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই জলবায়ু পরিবর্তন একটি প্রাসঙ্গিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। জলবায়ু পরিবর্তন এখন অনেক ক্ষেত্রে গবেষণার মূল বিষয় না হয়ে একটি প্রেক্ষাপট বা শর্তে পরিণত হয়েছে। আগে প্রশ্ন ছিল, জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে কি না? এরপর প্রশ্ন হয়েছে, এর জন্য মানুষ কতটা দায়ী? পরে প্রশ্ন হয়েছে, এর ফলে পৃথিবীর কী হবে? এখন প্রশ্ন অনেক বেশি নির্দিষ্ট, জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে কৃষিকে প্রভাবিত করছে? কীভাবে এটি অভিবাসন বাড়াচ্ছে? কীভাবে এটি স্থানীয় শাসনব্যবস্থাকে পরিবর্তন করছে? কীভাবে এটি বৈষম্য বাড়াচ্ছে?
ফলে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা কমেনি। বরং গবেষণার পরিমাণ অনেক বেড়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো দেখাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রের সংখ্যা এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু গবেষণার সংখ্যা এবং একটি বিষয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক আকর্ষণ এক জিনিস নয়।
কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে হাজার হাজার গবেষণা হতে পারে। তারপরও বিষয়টি মানুষের কাছে নতুন বা উত্তেজনাপূর্ণ নাও মনে হতে পারে। আমার মনে হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ঠিক এমনটাই ঘটছে। বিষয়টি এখন এত বেশি পরিচিত যে এর মধ্যে আগের মতো নতুনত্ব নেই। এটি একটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা হয়ে গেছে।
একসময় জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কথা বললেই বিশেষ ধরনের বৈশ্বিক সংকটের অনুভূতি তৈরি হতো। এখন বিষয়টি অনেক বেশি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা এখন অর্থনীতি, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন নীতির সাধারণ আলোচনার অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানও বিষয়টির প্রতি মানুষের অনুভূতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। মার্কিন ফেডারেল সরকারের জলবায়ু নীতিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি অনীহা দেখা যাচ্ছে। প্যারিস চুক্তি থেকে সরে যাওয়া, জলবায়ু নীতি দুর্বল করার চেষ্টা এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা বা বিনিয়োগ শেষ হয়ে গেছে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য, শহর, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এখনো জলবায়ু ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি নিয়ে কাজ করছে। তাই এখানে মূল বিষয়টি হলো বিলুপ্তি নয়, বরং রাজনৈতিক বিভাজন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন