শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ শুরু করার আগে যা জানা জরুরি
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে দ্রুত ধনী হওয়ার গল্প আমরা প্রায়ই শুনি—কেউ একটা শেয়ার কিনে রাতারাতি লাভবান হয়েছেন, কেউ বা অল্প সময়ে অনেক টাকা কামিয়েছেন। এই ধরনের গল্প শুনে অনেকে না বুঝেই বাজারে টাকা ঢুকিয়ে দেন, আর পরে লোকসান হলে বলেন, শেয়ারবাজার খুব ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সমস্যাটা বাজারে নয়, প্রস্তুতির অভাবে। সঠিক জ্ঞান আর পরিকল্পনা ছাড়া বিনিয়োগ করলে যেকোনো বাজারই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শেয়ারবাজারে ঢোকার আগে নিজের একটা জরুরি তহবিল তৈরি করে রাখা। এই তহবিলে অন্তত তিন থেকে ছয় মাসের সংসার খরচের সমান টাকা থাকা উচিত। এর কারণ হলো, শেয়ারের দাম হঠাৎ কমে যেতে পারে, আর ঠিক সেই সময়েই যদি হঠাৎ টাকার প্রয়োজন হয়, তাহলে লোকসানের মধ্যেই শেয়ার বিক্রি করে দিতে বাধ্য হতে হয়। জরুরি তহবিল প্রস্তুত না থাকলে বিনিয়োগ শুরু না করাই বুদ্ধিমানের কাজ, কারণ এই তহবিলই আসলে বিনিয়োগকারীকে ধৈর্য ধরে রাখার সুযোগ দেয়।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, ঋণ করে কখনো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ না করা। ধার নিয়ে বা ক্রেডিট কার্ডের টাকা দিয়ে শেয়ার কেনা সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুলগুলোর একটি। কারণ শেয়ারের দাম কমে গেলে, একদিকে বিনিয়োগের ক্ষতি হয়, অন্যদিকে ঋণের বোঝাও থেকে যায়—এই দুই চাপ একসঙ্গে সামলানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই একটা সহজ নিয়ম মেনে চলা উচিত—শুধু সেই টাকাই বিনিয়োগ করা উচিত, যেটা হারিয়ে গেলেও দৈনন্দিন জীবনে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না।
তৃতীয় বিষয়টি হলো, শেয়ারবাজারকে জুয়ার সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলা। শেয়ারে বিনিয়োগ মানে আসলে একটা কোম্পানির আংশিক মালিক হওয়া। তাই বিনিয়োগ করার আগে জানা দরকার, কোম্পানিটা আসলে কী ধরনের ব্যবসা করে, তাদের আয়-ব্যয়ের অবস্থা কেমন, আর ভবিষ্যতে বাড়ার সম্ভাবনা কতটা। এই বিষয়গুলো না বুঝে শুধু দাম বাড়া-কমার দিকে তাকিয়ে টাকা লাগানো বিনিয়োগ নয়, এটা আসলে জুয়া খেলার মতোই ঝুঁকিপূর্ণ। একজন প্রকৃত বিনিয়োগকারী কোম্পানির ভেতরের অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত নেন, শুধু বাজারের হাওয়া দেখে নয়।
চতুর্থ বিষয় হলো, দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাজারে ঢোকা। শেয়ারের দাম প্রতিদিন ওঠানামা করে, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। যারা কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে লাভের আশা নিয়ে বিনিয়োগ করেন, তারা বেশিরভাগ সময় হতাশ হন, কারণ স্বল্পমেয়াদে বাজারের গতিবিধি অনুমান করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ইতিহাস বলে, যারা কয়েক বছর ধরে ধৈর্য নিয়ে বিনিয়োগ ধরে রাখতে পারেন, তাঁদের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। তাই তাৎক্ষণিক লাভের আশা না করে, বছরের পর বছরের পরিকল্পনা নিয়ে বাজারে প্রবেশ করা উচিত।
পঞ্চম বিষয়টি হলো, সব টাকা একটিমাত্র জায়গায় বিনিয়োগ না করা। একটা মাত্র কোম্পানির শেয়ারে পুরো টাকা রাখলে ঝুঁকি অনেকখানি বেড়ে যায়, কারণ সেই একটা কোম্পানিতে কোনো সমস্যা হলে পুরো বিনিয়োগই ক্ষতির মুখে পড়ে। এর বদলে বিভিন্ন খাতের, বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারে টাকা ভাগ করে রাখলে, একটা জায়গায় লোকসান হলেও বাকি বিনিয়োগ সেই ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে দিতে পারে। এই নীতিকেই বিনিয়োগের ভাষায় বলা হয় ডাইভার্সিফিকেশন, আর নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য এটা মেনে চলা বিশেষভাবে জরুরি।
ষষ্ঠ বিষয়টি হলো, বড় অঙ্ক দিয়ে শুরু না করে ছোট অঙ্ক দিয়ে শেখা শুরু করা। প্রথমেই বিশাল অঙ্কের টাকা নিয়ে বাজারে ঢোকার দরকার নেই। ছোট অঙ্ক দিয়ে শুরু করলে বাজার আসলে কীভাবে কাজ করে, সেটা বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, আর কোনো ভুল হলেও সেই ভুল থেকে শেখার সুযোগ থাকে, বড় ধরনের ক্ষতি ছাড়াই। অভিজ্ঞতা আর আত্মবিশ্বাস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানো যায়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বিনিয়োগ
- শেয়ারবাজার