দলীয় প্রভাবমুক্ত স্থানীয় নির্বাচনই সময়ের দাবি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আমরা প্রায়ই জাতীয় রাজনীতির ছায়ায় দেখি। অথচ একজন সাধারণ নাগরিকের জীবনে জাতীয় সংসদের একজন সদস্যের চেয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদের প্রতিনিধি, পৌর মেয়র কিংবা সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরের সিদ্ধান্ত অনেক বেশি প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে।
বাড়ির পাশের রাস্তা, ড্রেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি, জন্মনিবন্ধন, স্থানীয় বাজার, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি—নাগরিক জীবনের অসংখ্য প্রয়োজনের সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সরাসরি যুক্ত। ফলে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন কেবল জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গণতন্ত্রের সবচেয়ে কাছের সম্পর্ক।
দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন না হওয়ায় সেই সম্পর্কেই এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য ও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, দেশের পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বড় ধরনের নির্বাচনী জট তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, দেশে ১৩টি সিটি করপোরেশন, ৫০০ উপজেলা পরিষদ, ৬১টি জেলা পরিষদ ও ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে এবং দীর্ঘ সময় স্থানীয় নির্বাচন না হওয়ায় বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের অপেক্ষায়।
এর অর্থ শুধু এই নয় যে কিছু পদে নির্বাচন হয়নি। এর অর্থ হলো স্থানীয় গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে। কোথাও নির্বাচিত পরিষদের মেয়াদ শেষ হয়েছে, কোথাও প্রশাসক দায়িত্ব পালন করছেন। প্রশাসক দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালানো কখনো কখনো জরুরি পরিস্থিতির সাময়িক সমাধান হতে পারে; কিন্তু সেটি নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের বিকল্প হতে পারে না। কারণ প্রশাসক জনগণের ভোটে আসেন না, ফলে তাঁর কাছে সরাসরি রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির বাধ্যবাধকতাও একই মাত্রায় থাকে না।
এখন অবশ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাত ধাপে করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম ধাপের সম্ভাব্য ভোট ১২ নভেম্বর; এরপর ১৩ ডিসেম্বর, ৩০ ডিসেম্বর, ১৭ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২২ এপ্রিল ও ২৭ মে পর্যায়ক্রমে ভোট হওয়ার কথা।
প্রথম ধাপে ৮০ উপজেলায় নির্বাচন করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এই নির্বাচনী রোডম্যাপ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর অচলাবস্থা কাটানোর একটি সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সময়সূচি ঘোষণা করাই শেষ কথা নয়; প্রতিটি ধাপ যেন সত্যিকার অর্থে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। বহুদিন নির্বাচন না হওয়ায় মানুষের মধ্যে যে অনীহা ও অনাস্থা তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে নির্বাচন কমিশনকে শুধু ভোটের দিনটি নয়, পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকেই বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে। কারণ একটি সুষ্ঠু নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করে না, দীর্ঘদিন স্থবির হয়ে থাকা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাও ফিরিয়ে আনে।
এই অবস্থায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন যত দ্রুত সম্ভব হওয়া প্রয়োজন। তবে শুধু নির্বাচন হলেই চলবে না; নির্বাচন হতে হবে এমন, যাতে পরাজিত প্রার্থীও ফল মেনে নিতে পারেন এবং বিজয়ী প্রার্থীও বুঝতে পারেন—তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়ে ক্ষমতা পেয়েছেন, প্রতিদ্বন্দ্বীদের অধিকার কেড়ে নিয়ে নয়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- স্থানীয় সরকার নির্বাচন