নতুন পে-স্কেল ও মূল্যস্ফীতি : সামঞ্জস্য জরুরি
প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রাষ্ট্র্রনিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে (সরকারি কর্মকর্তাদের) কর্মরতদের (রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী) জন্য প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেল গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদিত হয়েছে। গেজেট আকারে প্রকাশিত হওয়ার পর চার ধাপে এ নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানা গেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির এ উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং পেনশনভোগীদের জন্য স্বস্তি বয়ে এনেছে। বর্তমান উচ্চ বাজারমূল্যের সঙ্গে সংগতি রেখে বিভিন্ন স্কেলে বেতন বাড়ানো হয়েছে। এ মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির প্রয়োজন ছিল। সরকার সেই আবশ্যকতাকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের বেতন-ভাতা বাড়িয়েছে। একইসঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন সুবিধাও বেড়েছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে প্রথমবারের মতো পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই সময় সর্বনিম্ন ক্যাটাগরির একজন কর্মচারীর মূল বেতন ছিল ১৩০ টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন ছিল ২ হাজার টাকা। নতুন পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ গত ৫৩ বছরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন বেড়েছে ১৫৪ গুণ। কর্মরত ও অবসরভোগী মিলিয়ে প্রায় ২৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী বর্ধিত বেতন-ভাতার সুবিধা পাবেন।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক নানা সমস্যার কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। করোনা-উত্তর বিশ্ব অর্থনীতি যখন উত্তরণের পর্যায়ে ছিল, তখন ২০২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। একই বছরের জুনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। এটি ছিল দেশটির বিগত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। বিশ্বের মোট দানাদার খাদ্যের ৩০ শতাংশের জোগান দেয় রাশিয়া ও ইউক্রেন। যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের খাদ্যভর্তি জাহাজগুলো বন্দরে আটকে পড়ায় বিশ্বের বিভিন্ন স্থান, বিশেষ করে আফ্রিকার দেশগুলোতে খাদ্যাভাব দেখা দেয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সাময়িক ব্যবস্থা হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকা (ফেড) বারবার পলিসি রেট বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি আরও কার্যকর নানা ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। ফেডের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে অন্তত ৭৭টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট বারবার বাড়াতে থাকে। এর মাধ্যমে অন্তত ৬০টি দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে তা সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বারবার পলিসি রেট বাড়াতে থাকে। একপর্যায়ে পলিসি রেট ৫ শতাংশ থেকে বাড়াতে বাড়াতে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। বর্তমানে পলিসি রেট কিছুটা কমানো হয়েছে; কিন্তু নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরও আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে সৃষ্ট উচ্চ মূল্যস্ফীতি এখনো সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসেনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সমস্যাগ্রস্ত দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলংকা যে সাফল্য দেখিয়েছে, তা অনেকের জন্যই অনুকরণীয় হতে পারে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬৯ দশমিক ৯ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ৯৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এ বছরের জুনে শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতির হার ৬ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সাফল্য দেখাতে পারছে না। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে সাধারণ মানুষের জীবন এখন দুর্বিষহ। বিশেষ করে যারা দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ, তারা বড়ই অসহায় অবস্থায় দিনযাপন করছে। একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের গবেষণায় উল্লেখ করেছিল, করোনাকালীন অন্তত ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ কর্মচ্যুত হয়ে অথবা উচ্চ মূল্যস্ফীতির অভিঘাত সহ্য করতে না পেরে শহর থেকে গ্রামে চলে গেছেন। গ্রামে চলে যাওয়া মানুষদের মধ্যে কত শতাংশ আবার শহরে ফিরে আসতে পেরেছেন, তা জানা যায়নি। উচ্চ আয়ের মানুষ মূল্যস্ফীতির কারণে খুব একটা সমস্যায় না পড়লেও যারা নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ, তারা খুবই জটিল অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। প্রয়োজনীয় ব্যয় কাটছাঁট করে তারা সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- মূল্যস্ফীতি
- পে-স্কেল