আর কত প্রাণ গেলে নিরাপদ হবে যাত্রা?
একজন মানুষ বাসে উঠলেন। তাঁর হাতে হয়তো অফিসের ব্যাগ, পাশে সন্তান কিংবা দূরের বাড়ি ফেরার তাড়া। তিনি শুধু একটি আসন চান, নির্ধারিত ভাড়া দিতে চান এবং নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে চান। এই চাওয়াগুলো খুব বেশি কিছু নয়। অথচ বাংলাদেশের গণপরিবহনে এ সামান্য প্রত্যাশাগুলোই অনেক সময় বিলাসিতার মতো মনে হয়। বাসে উঠেই যাত্রীকে ভাবতে হয়—ভাড়া কত চাইবে, বাসটি আদৌ নিরাপদ কি না, চালক অতিরিক্ত গতিতে চালাবেন কি না, পথে নামিয়ে দেবেন কি না, প্রতিবাদ করলে অপমানিত হতে হবে কি না। আরও বড় ভয়—জীবিত অবস্থায় গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে তো?
গতকাল ১৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে যাত্রী অধিকার দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ২০১৯ সাল থেকে প্রতীকীভাবে এ দিবস পালন করে আসছে। যাত্রী হয়রানি, ভাড়া নৈরাজ্য, পরিবহনে বিশৃঙ্খলা, দুর্ঘটনা ও অনিয়মের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরিই এর অন্যতম উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কয়েক বছর ধরে দিবসটি পালনের পরও যাত্রীদের মৌলিক নিরাপত্তা কেন নিশ্চিত হলো না?
প্রশ্নটি কেবল বাসের নয়। সড়ক, রেল ও নৌপথ—সব ধরনের যাত্রীর ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা নাগরিক অধিকারের অংশ। একজন মানুষ যখন টিকিট কিনে কোনো পরিবহন ব্যবহার করেন, তখন তিনি কেবল একটি সেবা কিনছেন না; তিনি রাষ্ট্রের একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখছেন। সেই আস্থার বিনিময়ে তাঁর নিরাপদ যাত্রার নিশ্চয়তা পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই উল্টো।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই বিষয়টির ভয়াবহতা বোঝা যায়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছেন। তাদের হিসাবে আগের বছরের তুলনায় দুর্ঘটনা বেড়েছে ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ, মৃত্যু ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা ১৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
তবে দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান নিয়ে দেশে দীর্ঘদিন ধরেই বড় ধরনের বিভ্রান্তি রয়েছে। সরকারি হিসাবে ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৪৮০ জন নিহত হয়েছেন; অন্যদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৭ হাজার ২৯৪ এবং যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে ৮ হাজার ৫৪৩। এই পরিসংখ্যানের পার্থক্য নিজেই একটি বড় সমস্যা। কারণ যে দেশে দুর্ঘটনার তথ্যের নির্ভরযোগ্য, সমন্বিত ও স্বচ্ছ জাতীয় তথ্যভান্ডার নেই, সেখানে দুর্ঘটনা কমানোর নীতিও কতটা কার্যকর হবে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ২০২১ সালের সড়ক দুর্ঘটনায় সরকারি হিসাবে ৫ হাজার ৮৪ জন মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে সংস্থাটির মডেলভিত্তিক অনুমান ছিল ৩১ হাজার ৫৭৮ মৃত্যু। এই বিপুল ব্যবধান দেখায়, দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র জানতে আমাদের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ ব্যবস্থাকেও নতুন করে ভাবতে হবে।
কিন্তু সংখ্যা দিয়ে যাত্রী নিরাপত্তার পুরো গল্প বলা যায় না। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার। একটি মৃত্যু মানে একজন মানুষের জীবন শেষ হওয়া নয়; একটি পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া, সন্তানের পড়াশোনা অনিশ্চিত হওয়া, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভরসা হারানো কিংবা একটি শিশুর সারাজীবনের জন্য বাবাহীন বা মায়ের স্নেহহীন হয়ে পড়া। সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতি তাই হাসপাতালের বিছানা কিংবা থানার মামলার কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে পরিবার, অর্থনীতি ও সমাজে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত