মানবের সাথে যন্ত্রদানবের সম্ভব্য সভ্যতাবিনাশী সংঘাতের বিষয়টি ইতিহাসে বহুচর্চিত। যে বিষয়টি ব্রিটিশ সাহিত্যিক ম্যারি ওলস্টোনক্র্যাফ্ট শেলি ১৮১৮ সালে তার ফ্রাঙ্কেনস্টাইন অথবা দ্য মডার্ন প্রমিথিউস উপন্যাসে বিস্তারিত তুলে ধরেছিলেন। উচ্চারণ করেছিলেন সর্বোচ্চ সতর্কতা।
ম্যারি শেলির সেই সতর্কতা এক নতুন আতঙ্ক হয়ে ২০২৬ সালে বিশ্বসভ্যতার সামনে হাজির হয়েছে। যে ঝুঁকি বা শঙ্কার নাম হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বর্তমান যুগের অনিবার্য ফ্রাঙ্কেনস্টাইন। এখানে একটু উল্লেখ করা প্রয়োজন ম্যারি শেলি সেই বিখ্যাত উপন্যাসের বিজ্ঞান গবেষণায় তৈরি দানবের নাম ফ্রাঙ্কেনস্টাইন ছিল না।
ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন ছিলেন একজন সুইস বিজ্ঞানী যিনি গবেষণাগারে দানবিক মানব শরীরে প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন। যদিও বিজ্ঞানের আত্মবিনাশী ও ধ্বংসাত্মক আবিষ্কার বুঝাতে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অভিযাত্রায় বর্তমান সময়কে যৌক্তিকভাবেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। নিঃসন্দেহে এই যুগে মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ও নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে সক্ষম যন্ত্র অভূতপূর্ব সম্ভাবনা তৈরি করছে।
চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সামর্থ্য সম্পন্ন এই যন্ত্র মানুষের বহু জটিল কাজ সহজ করে দিয়েছে। কমিয়েছে ঝুঁকি, বাঁচিয়েছে সময়, তৈরি করেছে নতুন সম্ভাবনা। শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, পর্যবেক্ষণ, সমুদ্র থেকে মহাকাশ গবেষণা—এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার হচ্ছে না।
বেকারিতে রুটি তৈরি থেকে শুরু করে শিল্প ইউনিটে জটিল চিপ তৈরিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আর এরই সাথে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানিগুলোর মধ্যে শুরু হয়েছে এক তীব্র প্রতিযোগিতা।
বিশ্বের প্রধান প্রযুক্তি জায়ান্ট যেমন মাইক্রোসফট, এ্যামাজন ও গুগল এআই নিয়ে এক তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত। যাকে অনেকেই উল্লেখ করছেন প্রযুক্তিগত গোল্ডরাশ হিসেবে। সাথে পুরোপুরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি কোম্পানি অ্যানথ্রপিক, ওপেনএআই তো আছেই। এখানেই মানবসভ্যতা বিনাশের শঙ্কা করছেন প্রযুক্তিবিদরা। তাদের শঙ্কা এআই-এর লাগামহীন বিস্তার ধ্বংস করত পারে মানবসভ্যতাকে। যার নমুনা এখনই দৃশ্যমান।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কীভাবে বিশ্বের জন্য অনিবার্য হুমকি তৈরি করেছে তার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। বর্তমান বিশ্ব প্রায় ইন্টারনেট নির্ভর। যদি কোনো কারণে সারাবিশ্বে মাত্র ৩০ মিনিটের জন্য ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকে তাহলে পৃথিবীতে মহাবিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী দারিও অ্যামোদেই উল্লেখ করেছেন, আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টের একটি ‘সোয়ার্ম’ (একত্রিত ঝাঁক) স্থায়ী বটনেট তৈরির মাধ্যমে পুরো ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে। যার ফলে সম্ভাব্য ক্ষতি হতে পারে কয়েকশ বিলিয়ন ডলার। হতে পারে ভয়ঙ্কর নিরাপত্তা ঝুঁকি।