হাম-ডেঙ্গুতে মৃত্যু : আমরা কি কেবল সংখ্যা গুনেই যাব?
হামে মৃত্যু হাজার ছাড়িয়েছে, এমন খবর যখন সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়, তখন আমরা কিছুক্ষণ থমকে যাই। তারপর? কয়েক দিন পর আমরা আবার অন্য কোনো খবর নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ব। কিন্তু যে মা তার সন্তান হারালেন, যে বাবা তার সন্তানের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেন, তাদের কাছে এই ‘সংখ্যা’ কি কখনো একটি সংখ্যা?
এক হাজার মানে এক হাজার মানুষ। এক হাজার পরিবার। এক হাজার মায়ের বুক খালি হওয়া। এক হাজার বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের অপমৃত্যু। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে থাকে একটি মুখ, একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ। অথচ জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার আলোচনায় অনেক সময় সেই মানুষটি হারিয়ে যায় একটি পরিসংখ্যানের ভেতর। কিন্তু আসল প্রশ্ন সংখ্যাটি কত হবে, তা নয়। আসল প্রশ্ন, এই মৃত্যুগুলোর কতগুলো আমরা প্রতিরোধ করতে পারতাম?
টিকা দেওয়ার পরও হামের সংক্রমণ এবং মৃত্যুর লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না, তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের কোথাও না কোথাও ঘাটতি রয়েছে। সমস্যাটি হতে পারে, সব উপযুক্ত শিশু সময়মতো প্রয়োজনীয় টিকা পাচ্ছে না, অথবা আক্রান্ত শিশুরা সময়মতো সঠিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছে না।
এ ক্ষেত্রে পরিবারের সচেতনতার অভাব, আর্থিক অসচ্ছলতা, শিশুকে যথাসময়ে উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে না নেওয়া কিংবা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের সেবার ঘাটতি, সবকিছুই ভূমিকা রাখতে পারে। এর পাশাপাশি, আক্রান্ত শিশুর তীব্র অপুষ্টিও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু কমাতে শুধু টিকাদানের আওতা বাড়ালেই হবে না; টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের চিহ্নিত করা এবং আক্রান্তদের সময়মতো যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করাও জরুরি। টিকা দেওয়ার দায়িত্ব শুধু স্বাস্থ্যকর্মীর নয়; এটি পরিবার, কমিউনিটি, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সম্মিলিত দায়িত্ব।
কোথায় টিকা থেকে শিশুরা বাদ পড়ছে, কোন এলাকায় শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে এবং কেন কোনো পরিবার টিকা নিতে পারছে না, এসব তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুরা যেন দেরি না করে সঠিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পৌঁছায় এবং সেখানে প্রয়োজনীয় মানসম্মত চিকিৎসা পায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ হাম প্রতিরোধে টিকা যেমন অপরিহার্য, তেমনি আক্রান্ত শিশুর জীবন রক্ষায় সময়মতো সঠিক চিকিৎসাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুর মৃত্যু হলে তার পরিবার জানতে চায় না কোন দপ্তরের দায়িত্ব কতটুকু ছিল। তারা জানতে চায়, তাদের সন্তানকে কেন বাঁচানো গেল না?
এই প্রশ্নের জবাব দেওয়া সহজ নয়। কারণ প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে একই কারণ থাকে না। অনেক রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসেন, কারও অন্য জটিলতা থাকতে পারে, আবার কোথাও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বা মানের ঘাটতি থাকতে পারে। তাই মৃত্যুর সংখ্যা দেখেই কাউকে এককভাবে দায়ী করা ঠিক হবে না। কিন্তু প্রতিটি মৃত্যুর পর যদি আমরা কারণ খুঁজে না দেখি, তাহলে একই ধরনের মৃত্যু আবারও ঘটবে।
ডেঙ্গুতেও মৃত্যুর সংখ্যা একশ পেরিয়ে দ্রুত দুইশোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এরপর হয়তো সংখ্যা দুইশ হবে, তিনশ হবে, পাঁচশ হবে, কিংবা কোনো একসময় হাজারও ছাড়িয়ে যেতে পারে। আমরা তখন নতুন সংখ্যা জানবো, সংবাদ শিরোনাম হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হবে, দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা উদ্বেগ প্রকাশ করবেন। তারপর আবার নতুন কোনো খবর এসে পুরোনো খবরকে সরিয়ে দেবে। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা কি কেবল মৃত্যুর সংখ্যা গুনেই যাব?
- ট্যাগ:
- মতামত
- শিশুর মৃত্যু
- হাম রোগ