সংস্কৃতিচর্চার অপার সম্ভাবনা ফিরে আসুক

www.ajkerpatrika.com মামুনুর রশীদ প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০২

একটি সংবাদ পেলাম, আগামী শীতে প্রতিটি জেলা এবং উপজেলায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় নানা ধরনের শিল্পকর্মের আয়োজন করবে। নিঃসন্দেহে এটি একটি আনন্দের সংবাদ। অতীতে আমরা সংগীতের শক্তি প্রত্যক্ষ করেছি। দেশভাগের আগে ভারতের গণনাট্যসংঘ ভারতবর্ষজুড়ে মেহনতি মানুষের জন্য শিল্পের নানা শাখায় একটা বড় আয়োজন করেছিল। তার ঢেউ একেবারে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে গিয়েছিল। সেই সময়ের সংগীতের শিল্পীদের সুনাম সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল। যার মধ্যে ছিলেন সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এবং চলচ্চিত্রে খাজা আহম্মদ আব্বাস, নাটকে শম্ভু মিত্র, বিজন ভট্টাচার্য, উৎপল দত্ত, গীতি কবিতায় কাইফি আজমি। পাঞ্জাবেও অনেক বড় বড় শিল্পীর জন্ম হয়েছিল। সংগীত, নাটক, নৃত্যকলা এবং চারুকলায় জয়নুল আবেদিনের মতো প্রতিভারও জন্ম হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ভারত বিভক্ত হওয়ার পর এই বিশাল আয়োজনে ভাটা পড়তে থাকে। কলকাতা এবং মুম্বাইকেন্দ্রিক শিল্পে অনেক দিন পর্যন্ত প্রভাবটি জারি থাকলেও অন্যান্য প্রদেশে, বিশেষ করে পাকিস্তানে একেবারেই দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু পূর্ব বাংলায় প্রেরণাটি থেকেই যায়। যার ফলে ভাষার ওপর যখন আঘাত আসে, তখন এখানকার মানুষ যেমন বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিল, পাশাপাশি সংগীতও বড় একটি ভূমিকা পালন করেছিল। প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে সংগীত একেবারেই অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছিল।


ঢাকা কলেজের ছাত্র আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী লিখে ফেললেন, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’। পরবর্তী সময়ে এটি আলতাফ মাহমুদের সুরে চিরদিনের জন্য মানুষের মনে গেঁথে যায়। সেই সময় চট্টগ্রামের মাহবুবুল আলমের লেখা এবং আব্দুল লতিফের সুরেও বিভিন্ন গান মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে যায়। আব্দুল লতিফ সেখানেই থেমে থাকেননি। তাঁর অসাধারণ রচনা এবং সুরে ‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারো দানে কেনা নয়।’—গানটি আজও মানুষকে উজ্জীবিত করে এবং প্রেরণা দিয়ে থাকে। সেই সময়ে গ্রামবাংলার অনেক চারণ কবি পূর্ব বাংলার মানুষের দুর্দশা, ব্যথা-বেদনার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অনেক গান এবং কবিতা রচনা করেছেন। আমাদের চিরায়ত লোক সাহিত্য সে সময় একটা নতুন শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিল। আমাদের যাত্রাপালায়ও সেই সময় আমাদের প্রাণের কথা বারবার ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তখনকার রাজনীতিবিদরাও শিল্পের এই শক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছেন। এই অঞ্চলের মানুষের গভীর ধর্ম বিশ্বাস থাকার পরেও জায়নামাজের পাশে একটি হারমোনিয়ামও দেখা যেত। ভাষা আন্দোলনের সময় কারাবন্দীরাও গান গেয়ে, নাটক করে তখনকার চেতনার প্রবাহকে ধরে রেখেছিল।


একের পর এক পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর হঠকারী এবং গণতন্ত্রবিরোধী পদক্ষেপকে নানাভাবে প্রতিবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে শিল্পের মাধ্যমে। আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করার পরেও আন্দোলন থেমে থাকেনি। ষাটের দশকের গোড়ার দিকেই যখন রবীন্দ্রনাথকে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় মাধ্যমে বন্ধ করার আয়োজন চলছিল, তখন রবীন্দ্রনাথের শতবর্ষ পালিত হয়েছিল। বিচারপতি মোর্শেদের নেতৃত্বে গঠিত রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন এ অঞ্চলের মানুষের প্রতিবাদী চেতনারই বহিঃপ্রকাশ। তারপর ষাটের দশকজুড়ে আধুনিক গান, গণসংগীত, সাহিত্য, চলচ্চিত্র সব মাধ্যমেই তখনকার চলমান আন্দোলনের একটি বড় শক্তি হিসেবে মানুষের চেতনাকে শানিত করেছে।


এখানে প্রসঙ্গভাবে উল্লেখ করতে চাই, ১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানী কাগমারী সম্মেলন আয়োজন করেছিলেন। সেখানে রাজনৈতিক কর্মসূচি ছাড়াও সাংস্কৃতিক সম্মেলনের একটা বড় জায়গা স্থান পেয়েছিল। দেশ-বিদেশের সাহিত্যিক, গায়ক, নৃত্যবিদ যেমন এসেছিলেন; তেমনি আমাদের লোকশিল্প সেখানে স্থান পেয়েছিল। এসব কারণেই কাগমারী সম্মেলন উপমহাদেশকে একটি বড় ধরনের নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছিল। পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর পাকিস্তানিদের শোষণ-বঞ্চনার বিপরীতে একটি নতুন প্রতিবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকজুড়ে রাজনীতির একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল সংস্কৃতি। মধ্যবিত্তের জীবনে একটি প্রতিবাদী সংস্কৃতির জন্মও নিয়েছিল সেখানে।


এখানেই বিষয়টি থেমে থাকেনি। ক্রমান্বয়ে তা একটি সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে এগিয়ে যায়। দেখা যায়, একদিকে মুক্তিযোদ্ধারা বাঙ্কারে বসে যুদ্ধের পরিকল্পনা করছেন, অন্যদিকে তাঁদের কণ্ঠেই ধ্বনিত হচ্ছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত গণসংগীত। রাখাল গরু চরাতে চরাতে ‘আমার সোনার বাংলা’ গান গাইছে। গুলির আঘাতে মুমূর্ষু মুক্তিযোদ্ধা ‘ও আমার দেশের মাটি’ গাইতে গাইতে শহীদ হয়ে গেছেন। বাংলাদেশের এই অভূতপূর্ব বিজয়ের সঙ্গে সংস্কৃতির ভূমিকা অবিচ্ছেদ্য। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও এই বাস্তবতা বেশ কিছু দিন বিরাজমান ছিল। কিন্তু একাত্তরের সেই পরাজিত শক্তি সুকৌশলে দ্বিজাতি তত্ত্ব ও বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক দ্বিধাকে পুঁজি করে দেশটাকে বিভক্ত করে ফেলে।


এই বিভক্তির সংকটকে মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজন সংস্কৃতিচর্চা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সংস্কৃতিচর্চার সমগ্রটাই যদি সরকারের নির্দেশনা মতোই হয়, তাহলে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না। তাই এই কাজটি যথার্থ সংস্কৃতিকর্মীদের হাতে দিয়ে দেওয়াই একমাত্র উপায়। তর্ক-বিতর্ক চলুক, যার মধ্য দিয়ে সত্য প্রকাশ পাবে। আর সেই সঙ্গে নাটক, গান, কাব্য—এসবও স্বাধীনভাবে বিকশিত হওয়ার একটি সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। দেখা যায়, যেকোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও পেশিশক্তির একটা মহড়া শুরু হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা খুব বলিষ্ঠ হওয়া প্রয়োজন। কোনো অবস্থাতেই যেন মনে না হয়, কোনো বিশেষ গোষ্ঠী এসব অনুষ্ঠানকে তার নিজের রাজনৈতিক বিবেচনার মধ্যে না আনতে পারে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও