অর্থবছরের ভিত্তি মাস পরিবর্তন কতটা সুফল দেবে
সরকার আগামী বছর থেকে অর্থবছরের ভিত্তি মাস পরিবর্তনের চিন্তাভাবনা করছে। পরিকল্পনা মোতাবেক, অর্থবছরের ভিত্তি মাস হবে এপ্রিল। অর্থাৎ ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়কে এক অর্থবছর হিসাবে গণ্য করা হবে। বর্তমানে ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়কে এক অর্থবছর হিসাবে গণ্য করা হয়।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের সুবিধার্থে সরকার অর্থবছরের ভিত্তি মাস পরিবর্তন করতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। সেক্ষেত্রে ২০২৮-২০২৯ অর্থবছর ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ সময়টি অর্থবছর হিসাবে গ্রহণ করা হতে পারে। অর্থবছরের শেষ তিন মাস অর্থাৎ এপ্রিল-জুন বাংলাদেশে বর্ষাকাল হিসাবে বিবেচিত। এ সময় ঝড়-বৃষ্টিসহ নানা প্রকৃতিক দুর্যোগ লেগেই থাকে। ফলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে গৃহীত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে মন্থরতা সৃষ্টি হয়। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, অর্থবছর যদি মার্চ মাসে শেষ হয়, তাহলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাওয়া যাবে।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে অর্থবছরের ভিত্তি মাস পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন। অবশেষে তাদের সেই পরামর্শ বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। অবশ্য অনেকেই মনে করেন, অর্থবছরের ভিত্তি মাস পরিবর্তন হলেই যে এডিপি বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত বা দ্রুততর হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বিশ্বের অন্তত ১৩০টি দেশ জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থাৎ পঞ্জিকা বছরকেই অর্থবছর হিসাবে হিসাবে বিবেচনা করে থাকে। রাশিয়া, চীন, সৌদি আরব, ব্রাজিল ইত্যাদি দেশ ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর সময়কে অর্থবছর হিসাবে গণনা করে থাকে। অন্যদিকে ৩৩ থেকে ৩৫টি দেশ ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ সময়কে অর্থবছর হিসাবে বিবেচনা করে থাকে। এ ধারার উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারত, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, কাতার ও কুয়েত। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন সময়কে অর্থবছর হিসাবে বিবেচনা করে থাকে। কাজেই এপ্রিল-মার্চ সময়কে অর্থবছর হিসাবে বিবেচনা করা নতুন কিছু নয়। অধিকাংশ দেশে মূলত আবহাওয়াগত সমস্যা এড়ানোর জন্যই এপ্রিল-মার্চ সময়কে বিবেচনায় নিয়ে অর্থবছর গণনা করা হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু অর্থবছরের ভিত্তি মাস পরিবর্তন করা হলেই কি এডিপি বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত হবে? বিভিন্ন সময় গবেষণায় প্রতীয়মান হয়েছে, বাংলাদেশ এডিপির অধীনে গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশকিছু জটিল সমস্যা রয়েছে। বিদ্যমান এসব সমস্যা দূরীকরণের ব্যবস্থা করা না হলে শুধু অর্থবছরের ভিত্তি মাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এডিপি বাস্তবায়ন দ্রুততর করা সম্ভব নাও হতে পারে। এডিপির অধীনে গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির পেছনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড়করণে দীর্ঘসূত্রতা, প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, এক ব্যক্তিকে একাধিক প্রকল্পের পরিচালক নিয়োগদান এবং ঘনঘন প্রকল্প পরিচালকদের বদলি করা ইত্যাদি নানা কারণ রয়েছে। এছাড়া প্রকল্প অনুমোদন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে দুর্নীতির বিষয়টিও রয়েছে।
এডিপির আওতায় গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার রাষ্ট্রের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গতিশীল করে থাকে। দেশের মানুষ প্রত্যাশা করে, প্রতিবছর এডিপির অধীনে যেসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, তা যেন নির্ধারিত সময়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়। তাড়াহুড়া করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করাটাই একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। গৃহীত প্রকল্প যাতে গুণগত মানসম্মতভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটাই মূল বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত। সরকার যে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, তার অর্থের জোগানদাতা দেশের জনগণ। কাজেই এক্ষেত্রে কোনো ধরনের গাফিলতি কাম্য হতে পারে না। আমাদের দেশের একটি সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে, সরকারদলীয় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা তাদের সুবিধামতো বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে থাকেন। জাতীয় বা স্থানীয় পর্যায়ে সেই প্রকল্পের কোনো উপযোগিতা আছে কিনা, তা বিবেচনা করা হয় না। এমনও দেখা গেছে, ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে অথচ ব্রিজে ওঠার জন্য সংযোগ সড়ক নেই। ফলে নির্মিত ব্রিজটি আর জনস্বার্থে কোনো কাজে লাগে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্রিজ নির্মাণের জন্য লোহার রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এমন অনেক প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে, জাতীয় পর্যায়ে যার কোনো উপযোগিতা ছিল না। প্রকল্প গ্রহণকালে তার সম্ভাব্যতা ভালোভাবে যাচাই করা হয়নি। রাজনৈতিক বিবেচনায় দ্রুত প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এখন সেই প্রকল্পের জন্য রাষ্ট্রকে কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। কাজেই এডিপির অধীনে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে তার সম্ভাব্যতা এবং জনস্বার্থে প্রকল্পটি কতটা অবদান রাখতে পারে, তা দেখতে হবে।
সাধারণত প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে প্রজেক্ট ডিরেক্টর (পিডি) নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রায়ই এক ব্যক্তিকে একাধিক প্রকল্পের পরিচালক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে তার পক্ষে সব প্রকল্পের জন্য সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। এছাড়া মাঝেমাঝেই প্রকল্প পরিচালক বদলি করা হয়। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি মন্থর হয়ে পড়ে। সরকার সম্প্রতি এডিপির অধীনে গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বেসরকারি খাত থেকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদি উপযুক্ত, দক্ষ ও দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিকে বেসরকারি খাত থেকে এনে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে এটা ভালো ফল দিতে পারে। অন্যথায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। বিদ্যমান এসব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ না নিয়ে শুধু অর্থবছরের ভিত্তি মাস পরিবর্তন করা হলে কোনো লাভ হবে বলে মনে হয় না।
প্রতিবছর এডিপির আওতায় যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়, তা মোট জাতীয় বাজেটের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। বছর শেষে এডিপির ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে এডিপি বাস্তবায়নের যে হিসাব দেওয়া হয়, তার মধ্যে মারপ্যাচ রয়েছে। তারা মূলত বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের পরিসংখ্যানকে এডিপি বাস্তবায়নের চিত্র হিসাবে প্রদর্শন করে। কিন্তু প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় এবং প্রকৃত কাজের গুণগত বাস্তবায়ন এক বিষয় নয়। একটি প্রকল্পের অনুকূলে যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে, তার কতটুকু ছাড়করণ ও ব্যয় করা হয়েছে-তাকে অর্থ ব্যয়ের চিত্র বলা যেতে পারে। আর বরাদ্দকৃত অর্থ দিয়ে গৃহীত প্রকল্পটি গুণগত মানসম্মতভাবে কতটা সম্পন্ন হয়েছে-তাকে প্রকৃত বাস্তবায়নের অগ্রগতি বলা যেতে পারে। যেনতেনভাবে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে বরাদ্দকৃত অর্থ উত্তোলন করে নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটি যাতে গুণগত মানসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়, সেটাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। কাজেই শুধু অর্থ ব্যয় করতে পারার সক্ষমতার ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়নকে মূল্যায়ন করা যায় না। অর্থবছরের জন্য এডিপির অধীনে বরাদ্দকৃত অর্থ যাতে অব্যবহৃত থেকে না যায় বা মন্ত্রণালয়ে ফেরত যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য অর্থবছরের শেষ দুই মাসে (মে-জুন) প্রকল্প বাস্তবায়নের হিড়িক পড়ে যায়। এ সময় প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দকৃত অর্থ যেনতেনভাবে ব্যয় করার চেষ্টা করা হয়। এটাকে ‘জুন রাশ’ বলা যেতে পারে। এতে প্রকল্পের গুণগত মান নষ্ট হয়। এ ধরনের প্রবণতা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- এডিপি বাস্তবায়ন
- অর্থবছর