প্রতি মাসে আয়ের কত শতাংশ সঞ্চয় করা উচিত?
সঞ্চয় নিয়ে আমাদের প্রায় সবার মনেই একটা সাধারণ প্রশ্ন ঘোরে—প্রতি মাসে ঠিক কত টাকা সেভ করা উচিত? কেউ শুনেছেন বিশ শতাংশের কথা, কেউ বা বলেন যতটুকু পারা যায়, ততটুকুই যথেষ্ট। সমস্যা হলো, এই প্রশ্নের কোনো একটিমাত্র সঠিক উত্তর নেই। কারণ একজন পঁচিশ বছর বয়সী তরুণের জন্য যে হিসাব কাজ করে, চল্লিশ বছর বয়সী একজন পরিবারপ্রধানের জন্য সেই একই হিসাব যথেষ্ট নাও হতে পারে। বয়স, দায়িত্ব আর জীবনের পরিস্থিতি বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চয়ের হারও বদলানো উচিত।
একটা সাধারণ গাইডলাইন হিসেবে বলা যায়, আয়ের অন্তত বিশ শতাংশ সঞ্চয় ও বিনিয়োগে রাখা উচিত। এর মধ্যে জরুরি তহবিল, অবসরকালীন সঞ্চয় আর অন্যান্য বিনিয়োগ—সবকিছুই ধরা হয়। কিন্তু এই বিশ শতাংশ সংখ্যাটাকে একটা স্থির নিয়ম হিসেবে না দেখে, একটা শুরুর বিন্দু হিসেবে দেখাই ভালো। প্রকৃত হিসাবটা আসলে বয়সভেদে বদলে যাওয়া উচিত।
জীবনের শুরুর দিকে, অর্থাৎ বিশ থেকে পঁচিশ বছর বয়সে, ইনকাম সাধারণত কম থাকে, আর খরচও তুলনামূলক বেশি থাকে—নতুন চাকরি শুরু হওয়া, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর নানা খরচ। এই বয়সে বড় শতাংশের চাপ নিজের ওপর না দিয়ে, দশ থেকে পনেরো শতাংশ দিয়ে শুরু করাই যথেষ্ট। এই পর্যায়ে সংখ্যাটা যত গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সঞ্চয়ের অভ্যাসটা তৈরি করা। একবার এই অভ্যাস গড়ে উঠলে, পরবর্তীতে হার বাড়ানো তুলনামূলক সহজ হয়ে যায়।
পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে এসে সাধারণত ইনকাম বাড়তে শুরু করে। এই সময়ে সবচেয়ে সাধারণ ভুলটা হলো, বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাইফস্টাইলও বাড়িয়ে ফেলা। কিন্তু বুদ্ধিমানের কাজ হলো, ইনকাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চয়ের হারও বিশ থেকে পঁচিশ শতাংশে নিয়ে আসা। এই বয়সটাই আসলে বিনিয়োগ শুরু করার সবচেয়ে লাভজনক সময়, কারণ কম্পাউন্ডিংয়ের সুবিধা পাওয়ার জন্য এই সময়ে সবচেয়ে বেশি বছর হাতে থাকে।
পঁয়ত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে জীবনে সাধারণত বড় বড় দায়িত্ব চলে আসে—পরিবার, সন্তানের পড়াশোনা, বাড়ির ঋণ। এই সময়ে খরচ বাড়া স্বাভাবিক, কিন্তু তাই বলে সঞ্চয়ের হার কমিয়ে ফেলা ঠিক নয়। বরং ইনকাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চয়ের পরিমাণও বাড়ানো উচিত, প্রয়োজনে বাজেটের অন্য জায়গা থেকে খরচ কমিয়ে হলেও। এই পর্যায়ে সঞ্চয়ের হার পঁচিশ থেকে ত্রিশ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত।
পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চান্ন বছর বয়সে এসে অবসরের সময় ধীরে ধীরে কাছে আসতে শুরু করে, তাই সঞ্চয়ের গতিও বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়ে। এই বয়সে বসে হিসাব করে দেখা উচিত, অবসরের পর মাসিক খরচ চালাতে ঠিক কত টাকা প্রয়োজন হবে, আর এখন পর্যন্ত কতটা জমেছে। এই দুইয়ের মধ্যে যে ফারাক থাকে, সেটা পূরণ করার জন্য সঞ্চয়ের হার ত্রিশ শতাংশ বা তার বেশি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন হতে পারে।
পঞ্চান্ন বছরের পর থেকে অবশ্য চিত্রটা কিছুটা বদলে যায়। এই বয়সে নতুন করে সঞ্চয় বাড়ানোর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যা ইতিমধ্যে জমানো হয়েছে, সেটাকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা আর প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা। এই সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে, তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ, যাতে জীবনের এই পর্যায়ে এসে বড় কোনো আর্থিক ধাক্কা সামলাতে না হয়।