জিডিপির মোহ নয়, কর্মসংস্থানের অর্থনীতি চাই
বাংলাদেশের অর্থনীতির সাফল্য মাপতে দীর্ঘদিন ধরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিকে প্রধান সূচক হিসেবে দেখা হয়েছে। প্রবৃদ্ধি বাড়লে অর্থনীতি এগোচ্ছে, কমলে পিছিয়ে পড়ছে; এমন সরল হিসাব নীতিনির্ধারণেও প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা বলছে, শুধু উৎপাদনের হিসাব বাড়লেই মানুষের জীবনমান উন্নত হয় না। অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় কত মানুষের কাজ আছে, কাজের আয় কতটা নিরাপদ, মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে কি না এবং নতুন প্রজন্মের জন্য কতটা উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, তার ওপর।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। বিশ্ব ব্যাংক একই সময়ে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ৩ দশমিক ৭ শতাংশ অনুমান করেছে। হিসাবের পদ্ধতি ও সময়ভেদে পূর্বাভাসে পার্থক্য থাকতেই পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রবৃদ্ধির হার এখন আর আগের উচ্চ গতিতে নেই। তার সঙ্গে মূল্যস্ফীতি উচ্চ, বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশ্ব ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে ২০২৫ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৪ শতাংশে উঠেছে, যেখানে ২০২২ সালে তা ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি মূল্যস্ফীতির তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে। ফলে কাগজে-কলমে আয় বাড়লেও বাস্তবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এই পরিস্থিতি আমাদের অর্থনৈতিক সাফল্যের সংজ্ঞা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। অর্থনীতি তখনই মানুষের জন্য কার্যকর, যখন প্রবৃদ্ধির সুফল কর্মসংস্থান, আয় ও জীবনযাত্রার নিরাপত্তায় প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তরুণ জনগোষ্ঠী। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। অথচ শিক্ষিত তরুণদের বড় অংশ উপযুক্ত কাজ পাচ্ছে না। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সাধারণ বেকারত্বের তুলনায় বেশি। বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। এই বাস্তবতায় প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে না আনলে জনসংখ্যাগত সুবিধা ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হতে পারে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর কিছু অভিজ্ঞতা থেকে এ বিষয়ে আমরা দারুণ শিক্ষা নিতে পারি। যেমন, জার্মানির ডুয়াল কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে তত্ত্বীয় শিক্ষার পাশাপাশি সরাসরি শিল্পকারখানায় কাজ শেখে। ফলে লেখাপড়া শেষ করার আগেই তাদের কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা তৈরি হয় এবং প্রশিক্ষণ শেষে অনেকেই সেখানে স্থায়ী কাজের সুযোগ পেয়ে যায়। বাংলাদেশের কারিগরি ও উচ্চশিক্ষায় এমন কর্মমুখী ব্যবস্থা বিস্তৃত করা গেলে সনদধারী কিন্তু দক্ষতাহীন তরুণের সংখ্যা কমানো সম্ভব।
সিঙ্গাপুরও তাদের কর্মদক্ষতা উন্নয়নকে রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সেখানে কর্মজীবনের যে কোনো পর্যায়ে নতুন দক্ষতা শেখা কিংবা পুরনো দক্ষতাকে ঝালিয়ে নেওয়ার দারুণ সুযোগ তৈরি করে রাখা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে কাজের বাস্তব প্রয়োগ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা তৈরিতে রাষ্ট্র নিজে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক না রেখে বাস্তবভিত্তিক ও কর্মমুখী করে গড়ে তুলতে সিঙ্গাপুরের এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ডেনমার্কের শ্রমবাজার ব্যবস্থা থেকেও একটি চমৎকার শিক্ষা নেওয়া সম্ভব। সেখানে প্রতিষ্ঠানে কর্মী নিয়োগের নমনীয়তার পাশাপাশি চাকরি হারানো মানুষের সামাজিক আয়-সুরক্ষা, পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং অন্য কর্মসংস্থানে প্রবেশের ব্যাপক সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে শ্রমবাজারে যে কোনো পরিবর্তন আসলেও কর্মীরা সহজে নতুন কাজের সুযোগ পেয়ে যায়। বাংলাদেশের জন্য এর মূল শিক্ষাটি হলো, কর্মসংস্থান নীতি কেবল নতুন চাকরি সৃষ্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না বরং চাকরি হারানো মানুষকে নতুন দক্ষতায় গড়ে তুলে পুনরায় কাজের সুযোগ তৈরি করে দেওয়াও সমান জরুরি।
বাংলাদেশের আরেকটি বড় সমস্যা হলো অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান। বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়েছে। এসব কাজে আয় অনিয়মিত, উৎপাদনশীলতা কম এবং সামাজিক সুরক্ষা সীমিত। ফলে কেবল ঢালাওভাবে কর্মসংস্থানের সংখ্যা দিয়ে অর্থনীতির সাফল্য বিচার করলেও কাজের মান ও আয় নিরাপত্তা বিবেচনায় না নিলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। ভবিষ্যতের নীতিতে তাই ‘কতজন কাজ করছে’ এই প্রশ্নের পাশাপাশি ‘কী ধরনের কাজ করছে’ এবং ‘কাজ থেকে কত আয় করছে’; এই প্রশ্নগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জিডিপি প্রবৃদ্ধি