বর্তমান সরকারের সময়ও গুমের অভিযোগ, নতুন বিল নিয়ে ভুক্তভোগীর স্বজনদের ক্ষোভ
সাত বছরের মাহির শেখ রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। ছলছল চোখ, মুখে আতঙ্ক। বুকের সঙ্গে একটি ছবি চেপে ধরে বারবার চারপাশে তাকাচ্ছে। যেন ভিড়ের মধ্যেই খুঁজছে ছবির মানুষটিকে। ছবির মানুষটি তার বাবা মিরাজ শেখ। মাহিরের পাশে মা মুক্তা খাতুন। কান্নায় ভেঙে পড়ছেন বারবার। এসেছেন মাহিরের ফুফু আর দাদি। গোটা একটা পরিবারের দাবি একটাই, গুমের শিকার ‘মিরাজকে ফিরিয়ে দাও’।
আগামীকাল ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে আজ শনিবার রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে এক সেমিনারের আয়োজন করে। সেখানে এসেছিলেন মিরাজের মতো গুমের শিকার ব্যক্তিদের ২০টির মতো পরিবার এবং গুম থেকে ফিরে আসা দুজন।
আলোচনা সভায় ভুক্তভোগীরা কেঁদেছেন, ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বর্তমান সরকারের সময়ও নতুন করে গুমের ঘটনা ঘটছে বলে দাবি তাঁদের। এ ঘটনায় তাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। নতুন ‘গুম প্রতিরোধ আইন’ নিয়ে তাঁদের কেউ করেছেন ভর্ৎসনা। কেউ বলেছেন ‘বস্তা পচা আইন’। দাবি তুলেছেন গুমের তদন্ত যেন স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়। শেষে তাঁরা স্বজনদের ফিরে পাওয়ার দাবি জানিয়ে সরকারের একান্ত সাহায্য প্রার্থনা করেন।
অনুষ্ঠানে বাগেরহাটের নিখোঁজ মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খাতুন বলেন, ‘আমি নিজে দেখছি, কোস্টগার্ড আমার স্বামীকে নিয়া গ্যাছে। এহন তারা অস্বীকার করে।’ তিনি বলেন, মিরাজ সুন্দরবনে মাছ ধরার পাশাপাশি ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালাতেন। ১০ এপ্রিল (চলতি বছর) সন্ধ্যা সাতটার দিকে জয়মনির ঠোটা এলাকার একটি চায়ের দোকানের সামনে থেকে মিরাজকে সাদাপোশাকে থাকা দুজন কোস্টগার্ডের স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যায়। এবং নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর মোটরসাইকেলটি দোকানি আল-আমিনের জিম্মায় রেখে যায়। পরে ২১ এপ্রিল কোস্টগার্ড সদস্য রবিন পরিচয়ে এক ব্যক্তি চাবি দিয়ে খুলে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান। পরে তারা অস্বীকার করে যে মিরাজ তাদের কাছে নেই।’ মুক্তা বলেন, ‘আমি আমার স্বামীকে ফেরত চাই।’
গুমের শিকার এমন ভুক্তভোগী পরিবারের আরেকজন আনিশা ইসলাম ইনশা। তিনি বলেন, ২০১৯ সালের ১৯ জুন তাঁর বাবা ইসমাইল হোসেন বাতেন মিরপুর–১ থেকে গুম হন। এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এই সাত বছরেও বাবাকে পাননি। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়েও গুম হচ্ছে। ছোট্ট মাহির এসেছে ছবি হাতে তার বাবাকে খুঁজতে। কান্না জড়ানো কণ্ঠে আনিশা বলেন, ‘আমি এ ঘটনার নিন্দা জানাই। নতুন এই আইনের নিন্দা জানাই। আমি আমার বাবাকে চাই। আমি ছোট্ট মাহির শেখের বাবাকে ফেরত চাই। আমি চাই আর কোনো গুম না হোক।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ভুক্তভোগী পরিবারের আরেকজন আমেনা আক্তার। তিনি বলেন, তাঁর স্বামী ফিরোজ খান বিএনপির রাজনীতি করতেন। বরিশালের ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। ২০১২ সালের ২৪ আগস্ট তাঁকে গুম করে তৎকালীন সরকার। সেই সময় র্যাব তাঁকে গুম করে। আজও তাঁর সন্ধান মেলেনি।