ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড : ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপির স্বপ্ন

যুগান্তর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৭

বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতি লভ্যাংশ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলতে এমন একটি অবস্থাকে বোঝায়, যখন কোনো দেশের নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হ্রাস পায় এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী বলতে সেই শ্রেণির মানুষকে বোঝায়, যাদের বয়স ১ থেকে ১৫ বছর এবং ৬৫ বছর থেকে ঊর্ধ্বে। এ বয়সি মানুষ সাধারণত কর্মক্ষম থাকেন না। তারা চাইলেই নিজের শ্রমের বিনিময়ে উপার্জিত অর্থ দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন না। আর কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বলতে সেই শ্রেণির মানুষকে বোঝায়, যাদের বয়স ১৫ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে। এ বয়সে একজন মানুষ পূর্ণ কর্মক্ষম থাকে। পপুলেশন সাইন্সের ভাষায় একটি দেশের মোট জনসংখ্যার ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ যখন কর্মক্ষম পর্যায়ে থাকে, তখন তাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা বলা হয়। জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একটি দেশে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা একবারই সৃষ্টি হয়। আবার কারও কারও মতে, হাজার বছরে একবার এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। কোনো দেশ যদি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে, তাহলে দেশটি দ্রুত উন্নতির শিখরে পৌঁছতে পারে; আর যদি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে না পারে, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশটি সাধারণত কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্থনৈতিক উন্নতি অর্জন করতে সক্ষম হয় না।


আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড যুগে প্রবেশ করে এবং ২০০৭ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণমাত্রায় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সূচনা হয়। কারণ সেই সময় বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের বয়স ছিল ১৫ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার মধ্য দিয়ে গেলেও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এ নিয়ে তেমন কোনো সচেতনতা লক্ষ করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রম গতানুগতিক ধারাতেই চলছে। ফলে আমরা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুফল পুরোপুরি ভোগ করতে পারছি না। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। অভিজ্ঞজনদের মতে, বাংলাদেশ ২০৪০ সাল পর্যন্ত ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুবিধা ভোগ করতে পারবে।


বর্তমান সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের জিডিপির আকার ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে (এক লাখ কোটি) উন্নীত করার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। এটি অত্যন্ত কঠিন একটি চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জিডিপির আকার ৫১ বিলিয়ন ডলার। সেই হিসাবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আগামী ৮ বছরের মধ্যে জিডিপির আকার দ্বিগুণ করতে হবে। অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ বলছেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে হলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। প্রতিবছর স্থানীয় ও বিদেশি মিলিয়ে অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলারের সমতুল্য বিনিয়োগ আহরণ করতে হবে। যে কোনো অর্জনের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী বা দক্ষ জনশক্তি। কিন্তু জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য খুবই কম। বাংলাদেশের জনশক্তির বেশির ভাগই অদক্ষ ও প্রশিক্ষণবিহীন বলে তাদের উৎপাদনশীলতা অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। উদাহরণ হিসাবে ভিয়েতনামের কথা উল্লেখ করা যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসামগ্রী রপ্তানির ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী। বাংলাদেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। ভিয়েতনাম অবস্থান করছে তৃতীয় স্থানে। কিন্তু ভিয়েতনাম যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে দেশটি যে কোনো সময় বাংলাদেশকে টপকে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসতে পারে। ভিয়েতনামের শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাংলাদেশি শ্রমিকদের চেয়ে অনেক বেশি। একজন ভিয়েতনামি শ্রমিক প্রতিবছর জিডিপিতে ৪ হাজার ৭০০ ডলার থেকে ৫ হাজার ডলার মূল্য সংযোজন করে; আর বাংলাদেশের একজন শ্রমিক প্রতিবছর জিডিপিতে ৪ হাজার ১০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ ডলার মূল্য সংযোজন করে থাকে। অর্থাৎ ভিয়েতনামি শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাংলাদেশি শ্রমিকের চেয়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেশি। উচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা ভিয়েতনামি শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বেশি হওয়ার মূল কারণ। ভিয়েতনামি শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি এবং পুষ্টিমান বেশি হওয়ার কারণে তারা বাংলাদেশি শ্রমিকদের চেয়ে শারীরিকভাবে বেশি সক্ষম এবং কাজে বেশি মনোযোগী হয়ে থাকে।


ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে জনশক্তিকে জনসম্পদে পরিণত করার বিকল্প নেই। আশির দশকে অপরিকল্পিত জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে দেশের ‘এক নম্বর জাতীয় সমস্যা’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এটি ছিল চরম ভুল। কারণ জনসংখ্যা, তা পরিকল্পিতই হোক বা অপরিকল্পিত, কখনো এক নম্বর জাতীয় সমস্যা হতে পারে না। কারণ জনসংখ্যা এমন এক উপকরণ, যা ছাড়া কোনো উৎপাদন কার্যসম্পাদিত হতে পারে না। জনসংখ্যা যদি প্রশিক্ষিত ও দক্ষ হয়, তাহলে তা যে কোনো জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসাবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে। আর জনসংখ্যা যদি অপ্রশিক্ষিত, অদক্ষ ও পরনির্ভর হয়, তাহলে তা জাতির জন্য সবচেয়ে ‘বড় দায়’ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। জনসংখ্যাকে উন্নততর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনসম্পদে পরিণত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র যদি সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তার দায়ভার শুধু রাষ্ট্রের ওপরই বর্তায়। কোনোভাবে এ দায়িত্ব জনগণের ওপর চাপানো যাবে না।


ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুফল সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে একটি দেশ কীভাবে উন্নতির শিখরে পৌঁছতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ চীন। দেশটি একসময় তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ একটি উন্নয়নশীল দেশ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বিস্ময়ের সৃষ্টি করে চলেছে। চীনে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার শুরু হয় ১৯৭৯ সালে এবং তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে। ২০১৪ সাল থেকে চীনে নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর হার বাড়তে থাকে। চীন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুফল পরিকল্পিত ও সঠিকভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে; যার ফল তারা হাতে হাতে পেয়েছে। কয়েক বছর আগে চীন জাপানকে অতিক্রম করে বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্বিতীয় শক্তিশালী রাষ্ট্রের অবস্থানে উঠে এসেছে। চীন ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্ব অর্থনীতিতে জাপানকে অতিক্রম করে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। সেই সময় চীনের জিডিপির আকার ছিল ৫ দশমিক ৮৮ ট্রিলিয়ন ডলার; আর জাপানের জিডিপির আকার ছিল ৫ দশমিক ৪৭ ট্রিলিয়ন ডলার। জাপান ১৯৬৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত মোট ৪২ বছর বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্বিতীয় শক্তি হিসাবে অবস্থান করছিল। চীন ২০৩৫ থেকে ২০৩৭ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হতে পারে। অবশ্য কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ মনে করেন, চীনের কর্মক্ষম জনসংখ্যার হার কমতে শুরু করেছে। এ অবস্থায় দেশটি যদি শ্রমশক্তির উৎপাদন ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়াতে না পারে, তাহলে হয়তো কোনোদিনই অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করতে পারবে না। বর্তমানে চীনের জিডিপির আকার ২০ দশমিক ৮৫ ট্রিলিয়ন ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির আকার ৩২ দশমিক ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও