পাকিস্তান পারল, বাংলাদেশ পারল না কেন
সম্প্রতি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে পাকিস্তানের দুটি খবর আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গত ১৮ আগস্ট ইসলামাবাদে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের উপস্থিতিতে গুগল পাকিস্তানে তাদের প্রথম নিজস্ব অফিসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছে।
প্রায় একই সময়ে জানা গেল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাকিস্তানের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতের রপ্তানি আয় ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন বা ৪৬০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। নতুন অর্থবছরের জুলাইয়েও রপ্তানি হয়েছে ৪১৭ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি।
সংখ্যাটি বাংলাদেশের পাশে রাখা যায়। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের হিসাবে বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সেবা রপ্তানি প্রায় ৭০৩ মিলিয়ন ডলার; রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাবেও তা প্রায় ৭২৫ মিলিয়ন। সংজ্ঞা ও হিসাবের পদ্ধতিতে কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে। তাই সংখ্যাগুলো হয়তো সরাসরি তুলনীয় নয়; কিন্তু ব্যবধানটি যে বড়, তাতে সন্দেহ নেই।
অথচ ২০১০ সালে বিশ্বব্যাংকের তুলনাযোগ্য তথ্য অনুযায়ী এই খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ৩১৩ মিলিয়ন ডলার, পাকিস্তানের ৪৩৪ মিলিয়ন। ব্যবধান তখন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল না। দেড় দশক পরে পাকিস্তান ৪৬০ কোটি ডলারের ঘরে। আমরা কেন পারলাম না?
প্রশ্নটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ, দুই দেশেই তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠন প্রায় একই সময়ে গড়ে উঠেছে। পাকিস্তান সরকার ১৯৯৫ সালে পাকিস্তান সফটওয়্যার এক্সপোর্ট বোর্ড (পিএসইবি) প্রতিষ্ঠা করে। বাংলাদেশে ১৯৯৮ সালে এক বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য সামনে রেখে ১৮টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে বেসিস গঠিত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার বড় পরিবর্তন
পাকিস্তানের আজকের তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে বুঝতে শুধু সফটওয়্যার কোম্পানি বা মুক্ত পেশাজীবীদের দিকে তাকালে হবে না। আলোচনা শুরু করতে হবে আরও আগে থেকে। ২০০২ সালে পাকিস্তান সে সময়ের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের জায়গায় শক্তিশালী উচ্চশিক্ষা কমিশন (এইচইসি) গঠন করে। এর নেতৃত্ব দেওয়া হয় অধ্যাপক আতাউর রহমানকে।
তাঁর সময়ে গবেষণার মান ও কাজের ফলের সঙ্গে শিক্ষক-গবেষকদের বেতন ও পেশাগত অগ্রগতি যুক্ত করা হয়। বিদেশে থাকা গবেষকদের ফেরানো, গবেষণা অনুদান, ডিজিটাল গ্রন্থাগার এবং দেশে-বিদেশে পিএইচডি বৃত্তিতেও বড় বিনিয়োগ হয়।
২০০৩ সালে লাহোরের গভর্নমেন্ট কলেজ ইউনিভার্সিটিতে গড়ে ওঠে আবদুস সালাম স্কুল অব ম্যাথমেটিক্যাল সায়েন্সেস। প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক গণিতবিদ অধ্যাপক এ ডি আর চৌধুরীর সঙ্গে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের সুবাদে আমার যোগাযোগ ছিল। প্রতিষ্ঠানটি চকচকে অবকাঠামোর বদলে দেশি-বিদেশি উচ্চমানের গণিতবিদ এনে গবেষণা ও পিএইচডি তৈরিতে জোর দেয়। ২০১৪ সালের শুরুর মধ্যেই তারা শতাধিক পিএইচডি তৈরি করে। ভবনের চেয়ে মানুষ ও গবেষণার পরিবেশ বেশি জরুরি; পাকিস্তান তখনই সেটি বুঝেছিল।
এই মেধা তৈরির ধারার সাম্প্রতিক প্রতীক সুয়ালেহ আসিফ। করাচিতে বেড়ে ওঠা আসিফ ২০১৬ থেকে ২০১৮ টানা তিন বছর পাকিস্তানের হয়ে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েছে। সেখানে তার কৌতূহলোদ্দীপক চোখ আমি দেখেছি।
আসিফ পরে এমআইটিতে পড়তে গিয়ে সহপাঠীদের সঙ্গে গড়ে তোলে অ্যানিস্ফিয়ার ও কার্সর। কার্সর মার্কিন প্রতিষ্ঠান, কিন্তু পাকিস্তানি মেধা বিশ্বমানের উদ্ভাবনী পরিবেশ পেলে কোথায় যেতে পারে, তার একটি উদাহরণ হয়েছে এটি। বিশেষ করে সম্প্রতি ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান মাত্র ৬০ বিলিয়ন ডলারে এটি আত্তীকরণ করে নিয়েছে। আসিফ একদিকে নিজেকে গড়ে তুলেছে, অন্যদিকে তার মতো মেধাবীরা পাকিস্তানে থাকতে পারে—এমন বার্তাও বিশ্বকে দিয়েছে।
একইভাবে আমাদের সমস্যাও শুধু মেধার ঘাটতি নয়। আমাদের বহু প্রকৌশলী গুগল, মেটাসহ বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। প্রশ্ন হলো, সেই মেধাকে বাংলাদেশে বসেই বড় প্রতিষ্ঠান, নিজস্ব পণ্য ও রপ্তানি আয়ে রূপান্তর করতে আমরা কতটা পারছি?
রপ্তানিকে আলাদাভাবে দেখা
পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার একা ৪৬০ কোটি ডলারের ব্যাখ্যা নয়। পিএসইবির কাজের কেন্দ্রেই রয়েছে রপ্তানি—দক্ষ জনশক্তি, প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বিপণন ও বিদেশি বাজারে প্রবেশকে তারা একই চোখ দিয়ে দেখে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে পিএসইবি ৩০০টির বেশি প্রতিষ্ঠানকে ২০টি বড় আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি আয়োজনে নিয়ে গেছে।
কয় দিন আগে সৌদি আরবে সমাপ্ত হওয়া এলইএপি সম্মেলনে পাকিস্তানের শাতাধিক প্রতিষ্ঠানের সহস্রাধিক প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন। সেখানে ছিল পাকিস্তানের আলাদা রাষ্ট্রীয় প্যাভিলিয়ন। এসবের ফলে সেখান থেকে ৪ হাজার ২২৮টি সম্ভাব্য ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং প্রায় ৭৪ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা এসেছে বলে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থের সহজ চলাচলেও তারা সমস্যাটি ধরেছে। তথ্যপ্রযুক্তি রপ্তানিকারক ও মুক্ত পেশাজীবীরা রপ্তানি আয়ের বড় অংশ বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবে রাখতে এবং ব্যবসার প্রয়োজনে বিদেশে অর্থ পাঠাতে পারেন।
জটিলতা এখনো আছে; বিদেশের অফিস, বিপণন বা সফটওয়্যার সেবার খরচ মেটাতে অনেক উদ্যোক্তা সমস্যায় পড়েন। কিন্তু পিএসইবি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমস্যাটি স্বীকার করে প্রক্রিয়া সহজ করার চেষ্টা করছে। পাকিস্তানে এখনো পেপ্যাল আনুষ্ঠানিকভাবে চালু নেই, ইন্টারনেটের মান নিয়েও অভিযোগ আছে। অর্থাৎ সব সমস্যা মিটে যাওয়ার পর তাদের রপ্তানি বাড়েনি; সীমাবদ্ধতার মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জায়গা ঠিক করা হয়েছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- তথ্যপ্রযুক্তি খাত