ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত : বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ
ভারত-মিয়ানমার পুরোনো প্রতিবেশী হলেও দুদেশের ‘অসমাপ্ত সীমান্ত’ আবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। সীমারেখাটি ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার এবং ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ। কিন্তু কীভাবে এ সীমান্ত চিহ্নিত হবে, সেই প্রশ্নটি এখন নতুন সংকটের কারণ; যার সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ।
২০২৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর ভারতের মণিপুরের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, মিয়ানমারের সঙ্গে রাজ্যের ৩৯৮ কিলোমিটার সীমান্তের প্রায় ৫৫ কিলোমিটার বেড়া দেওয়া হয়েছে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে পুরো অংশে বেড়া দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর সমান্তরালে ২৬ মে ২০২৬ তারিখের একটি সরকারি নথি সামনে এসেছে, যা ভূখণ্ড বিনিময়ের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। মণিপুরের চান্দেল জেলায় সীমানা স্তম্ভ ৬৫ ও ৬৮-এর মধ্যবর্তী অমীমাংসিত অংশে প্রায় ১.৪ বর্গমাইল (৩.৫ বর্গকিমি.) ভূখণ্ড মিয়ানমারের কাবাও উপত্যকার সঙ্গে বিনিময়ের প্রস্তাব রয়েছে। ৪ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র স্বীকার করেছেন, ‘মিয়ানমার সীমান্তের কিছু এলাকা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি’ এবং ‘সেই খাতগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে।’
বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত-মিয়ানমার সীমান্তের স্থিতিশীলতা সরাসরি বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্ত, পার্বত্য চট্টগ্রাম, রোহিঙ্গা সংকট, মাদক পাচার এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। এ সীমান্ত বোঝার জন্য ইতিহাস জানা জরুরি। ১৮২৬ সালের ইয়ানডাবু চুক্তি এবং পরবর্তী সীমানা নির্ধারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ সীমান্তের ভিত্তি তৈরি হয়। ১৮৩৪ সালে ব্রিটিশরা কাবাও উপত্যকা বার্মার রাজ্যের কাছে ফিরিয়ে দেয় এবং মেজর এফজে গ্রান্ট ও ক্যাপ্টেন রবার্ট বয়েলো পেমবার্টনকে মণিপুর-বার্মা সীমান্ত নির্ধারণের দায়িত্ব দেয়, যা পেমবার্টন লাইন নামে পরিচিত হয়।
সমস্যা হলো, এ সীমানা নির্ধারণ সবসময় স্থানীয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না। নাগা, কুকি ও মিজো সম্প্রদায়ের মানুষ আন্তর্জাতিক সীমান্তের দুই পাশে বসবাস করতে শুরু করে-যদিও তাদের পারিবারিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক অটুট ছিল। ১৯৬৭ সালের ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত চুক্তি আধুনিক সীমানা নির্ধারণ করে এবং একটি যৌথ সীমান্ত কমিশন গঠন করে। এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৪৭২ কিলোমিটার সীমানা স্তম্ভের মাধ্যমে চিহ্নিত হয়েছে, বাকি প্রায় ১৭১ কিলোমিটার অমীমাংসিত।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। এদিকে মিয়ানমারে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত তীব্র হওয়ায় শরণার্থীর ঢল বেড়েছে। পাশাপাশি নাজুক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আন্তঃসীমান্ত অপরাধী নেটওয়ার্ক বিস্তার লাভ করেছে।
সীমান্ত চিহ্নিতকরণের বিতর্ক ভারতের ফ্রি মুভমেন্ট রেজিম (এফএমআর) বাতিলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ১৯৬৮ সাল থেকে চালু এবং ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত এ ব্যবস্থা সীমান্তের দুই পাশের সম্প্রদায়ের পারিবারিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে স্বীকৃতি দিত। এর আওতায় সীমান্তের কাছাকাছি বসবাসকারী বাসিন্দারা ভিসা বা পাসপোর্ট ছাড়াই ১৬ কিলোমিটার পর্যন্ত একে অপরের ভূখণ্ডে যেতে পারতেন; কিন্তু ২০২২ সাল থেকে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে মণিপুর সীমান্তে চলাচল কঠোর করা হয়। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪-এ ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এফএমআর বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে-অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর জনসংখ্যাগত কাঠামো রক্ষার কথা উল্লেখ করে। ডিসেম্বর ২০২৪-এ একটি কঠোর বিকল্প ব্যবস্থা চালু হয়-যেখানে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়, কিন্তু বায়োমেট্রিক স্ক্রিনিং ও সীমান্ত পাসের মাধ্যমে।
এ পরিবর্তন সীমান্ত চিহ্নিতকরণকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে-কারণ চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ সীমানার স্পষ্টতা ও নির্ভুলতার প্রয়োজন বাড়ায়। ভূখণ্ড বিনিময়ের যুক্তি ব্যবহারিক। কিন্তু এ ধরনের সমন্বয়ের বিস্তৃত আইনি ও প্রশাসনিক প্রভাব রয়েছে এবং স্থানীয় সম্প্রদায় ও তাদের প্রথাগত ভূমি ব্যবহারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।