সফলতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা কি আমরা নিজেরাই?
একটি স্বপ্ন। একটি পরিকল্পনা। একটি নতুন শুরু। প্রায় প্রতিটি মানুষের জীবনেই এমন কিছু ইচ্ছা থাকে, যা একদিন বাস্তবে রূপ দেওয়ার স্বপ্ন দেখা হয়। কেউ উদ্যোক্তা হতে চান, কেউ সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে নিজের অবস্থান গড়ে তুলতে চান, কেউ আবার একটি বই লিখতে, একটি ইউটিউব চ্যানেল খুলতে কিংবা বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেতে চান। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই স্বপ্নগুলোর কতটুকু বাস্তবে রূপ পায়?
বাস্তবতা বলছে, অসংখ্য স্বপ্ন কোনো প্রতিযোগিতায় হেরে যায় না, অর্থের অভাবে থেমে যায় না, এমনকি যোগ্যতার অভাবেও নয়। বরং সেগুলো থেমে যায় একটি ছোট্ট শব্দের কাছে—‘পরে’।
‘আগামী মাস থেকে শুরু করব’, ‘আরেকটু প্রস্তুতি নিই’, ‘পরিস্থিতি ভালো হলে শুরু করব’, ‘এই মুহূর্তে সময়টা ঠিক নয়’—এমন অসংখ্য অজুহাত আমাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, অর্থাৎ সময়কে নীরবে গ্রাস করে। দিন যায়, মাস যায়, বছর পেরিয়ে যায়; কিন্তু সেই শুরুটা আর হয় না।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মনোবিজ্ঞানী সংগঠন American Psychological Association (APA) জানিয়েছে, দীর্ঘদিন কাজ ফেলে রাখার অভ্যাস বা procrastination শুধু উৎপাদনশীলতাই কমায় না; এটি মানুষের মানসিক চাপ, উদ্বেগ, অপরাধবোধ ও আত্মবিশ্বাসের সংকটও বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ, আমরা যে কাজটি আজ না করে আগামীকালের জন্য রেখে দিচ্ছি, সেটিই পরবর্তীতে আমাদের সবচেয়ে বড় মানসিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
কানাডার মনোবিজ্ঞানী ও procrastination-বিষয়ক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষক ড. টিম পিচিল বলেছেন, ‘Procrastination is not a time management problem; it's an emotion management problem.’ অর্থাৎ, অধিকাংশ মানুষ সময়ের অভাবে নয়, বরং ব্যর্থতার ভয়, অনিশ্চয়তা, আত্মসন্দেহ কিংবা সাময়িক অস্বস্তি এড়ানোর জন্য কাজ শুরু করতে পারেন না। কঠিন কাজের বদলে মানুষ সহজ কাজ বেছে নেয়। সাময়িক স্বস্তি পায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তার মূল্য দিতে হয় স্বপ্ন হারিয়ে।
বাংলাদেশের বাস্তব চিত্রও খুব ভিন্ন নয়। প্রতিবছর লক্ষাধিক তরুণ বিসিএস, ব্যাংক, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান কিংবা বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু তাঁদের একটি বড় অংশ বছরের পর বছর শুধু প্রস্তুতি নিতেই ব্যস্ত থাকেন। পরীক্ষার ফরম পূরণ হয় না, আবেদন জমা দেওয়া হয় না, ব্যবসার লাইসেন্স নেওয়া হয় না, প্রথম ভিডিও আপলোড করা হয় না, প্রথম গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলা হয় না। ফলাফল—যেখানে ছিলেন, সেখানেই থেকে যান।
অন্যদিকে, হয়তো আরেকজন একই সময়ে সীমিত প্রস্তুতি নিয়েই শুরু করেন। প্রথমে ভুল করেন, সমালোচনার মুখোমুখি হন, ব্যর্থ হন। কিন্তু প্রতিটি ভুল থেকে শিক্ষা নেন। কয়েক বছর পর দেখা যায়, যিনি নিখুঁত মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করেননি, তিনিই এগিয়ে গেছেন বহুদূর।
Harvard Business Review-এ প্রকাশিত একাধিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত নিখুঁত হওয়ার প্রবণতা (perfectionism) অনেক সময় কাজ শুরু করার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ মানুষ মনে করে, সবকিছু ঠিকঠাক না হওয়া পর্যন্ত শুরু করা উচিত নয়। অথচ বাস্তবে ‘পারফেক্ট সময়’ বলে কিছু নেই। কাজ শুরু করার পরই মানুষ ধীরে ধীরে দক্ষ হয়ে ওঠে।
বিশ্বখ্যাত লেখক জেমস ক্লিয়ার তাঁর আলোচিত বই Atomic Habits-এ লিখেছেন, বড় পরিবর্তনের জন্য বিশাল কোনো পদক্ষেপের প্রয়োজন হয় না। বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট ধারাবাহিক অভ্যাসই একসময় অসাধারণ ফলাফল তৈরি করে। তিনি দেখিয়েছেন, একটি মাত্র ছোট কাজ—যেমন পাঁচ মিনিট পড়া, দশ মিনিট লেখা বা প্রতিদিন একটি ভিডিও তৈরি করা—ধীরে ধীরে মানুষের পরিচয়, দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।
এই কথার সঙ্গে মিল পাওয়া যায় স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আচরণবিজ্ঞানী ড. বি. জে. ফগের গবেষণাতেও। তাঁর মতে, মানুষ বড় সিদ্ধান্তে নয়, বরং ছোট অভ্যাসের ধারাবাহিকতায় বদলে যায়। একটি ছোট কাজ প্রতিদিন করলে সেটিই একসময় বড় সাফল্যের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সফলতা
- পরিকল্পনা
- স্বপ্ন বাস্তবায়ন