দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পাঁচ বছরের রোডম্যাপ

যুগান্তর ড. শাহ জে মিয়া প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে প্রতি দুই থেকে তিন বছরে প্রযুক্তির প্রজন্ম বদলে যায়, সেই সঙ্গে পরিবর্তনে আসে এর ব্যবহারের পরিধি। ফলে যে রোডম্যাপ আজকের প্রযুক্তিকে ধরে রচিত হবে, সেটি তিন বছর পর অচল হয়ে পড়বে। অতএব, আমাদের এমন একটি পরিকল্পনা দরকার, যা নির্দিষ্ট কোনো একটি প্রযুক্তির ওপর নয়, বরং সক্ষমতার ও আমাদের ভবিষ্যতের চাহিদার ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে।


এ প্রসঙ্গে আমি একটি কারিগরি বিষয় সহজ করে বলতে চাই, যেটি না বুঝলে বাংলা ভাষায় এআইয়ের মূল সমস্যাটি ধরা পড়বে না। বৃহৎ ভাষা মডেল লেখাকে সরাসরি অক্ষর হিসাবে পড়ে না, বরং লেখাকে ছোট ছোট টুকরায় ভাগ করে নেয়, যাকে বলা হয় ‘টোকেন’, আর ভাগ করার এ প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় ‘টোকেনাইজেশন’। সমস্যা হলো, প্রচলিত মডেলগুলো মূলত ইংরেজিসহ কিছু বহুল ব্যবহৃত ভাষার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, ফলে ইংরেজির একটি শব্দ যেখানে হয়তো একটি বা দুটি টোকেনে ধরা পড়ে, বাংলার একটি শব্দ সেখানে অনেক বেশি টোকেনে ভেঙে যায়। এর তিনটি সরাসরি ফল আছে : একই কাজ বাংলায় করতে বেশি খরচ পড়ে, মডেল একবারে কম পরিমাণ বাংলা লেখা বিবেচনায় নিতে পারে এবং যুক্তাক্ষরসমৃদ্ধ বাংলার ক্ষেত্রে উত্তরের গুণমানও তুলনামূলকভাবে কমে যায়। এ কারণেই বাংলা ভাষার জন্য মানসম্মত ডেটা কর্পাস এবং বাংলার উপযোগী টোকেনাইজার তৈরি করা দরকার।


বহিঃবিশ্বে আমাদের বিভিন্ন গবেষণা ও অন্যদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই দিকে ইঙ্গিত করে। চীন সম্প্রতি তার বিপুল বিনিয়োগ করে এ খাতে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে। সিঙ্গাপুর জাতীয় এআই কৌশলের পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভাষাগুলোর জন্য নিজস্ব ভাষায় এআইয়ের মডেল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। ভারত তার বহুভাষিক জনগোষ্ঠীর জন্য ভাষাপ্রযুক্তির জাতীয় কর্মসূচি এবং নিজস্ব গণনাশক্তি গড়ে তোলার পথে হাঁটছে। আর অস্ট্রেলিয়ায় আমি দেখছি দায়িত্বশীল এআই ও নিরীক্ষাযোগ্যতার প্রশ্নটিকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে নীতিতে রূপ দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের ভেতরে একটি সাধারণ সুর রয়েছে-‘সার্বভৌম এআই’ বা নিজের ভাষা, নিজের তথ্য এবং নিজের প্রয়োজনের ওপর দাঁড়ানো এআই সক্ষমতা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের জন্যও এটিই সঠিক পথ, কারণ আমদানি করা প্রযুক্তি সমাধান আমাদের সমস্যা বোঝে না বা বুঝবে না কখনো।


এখন আমরা আসি আজকের লেখার মূল প্রসঙ্গে। এ ধরনের পরিকল্পনা তৈরি করতে হয় গভীর কারিগরি জ্ঞানের ভিত্তিতে, অথচ এআইয়ের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল ক্ষেত্রে সর্বশেষ গবেষণালব্ধ জ্ঞান একটি মন্ত্রণালয়ের ভেতরে সবসময় থাকা সম্ভব নয়; কোনো দেশেই থাকে না, কিন্তু এ শূন্যস্থান পূরণ করে গবেষক ও পেশাজীবীদের সংগঠন। ঠিক এ প্রয়োজন থেকেই ২০২৬ সালের শুরুতে আমরা দেশে-বিদেশে সবাই একসঙ্গে বসে জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরামের যাত্রা শুরু করি। এখানে আইসিটি ব্যবসায়ী, গবেষক, প্রযুক্তিবিদ, উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তারা একসঙ্গে কাজ করছে। এ ফোরামের পক্ষ থেকে আমরা আগামী পাঁচ বছরের জন্য যে রোডম্যাপটি প্রস্তাব করছি, তাকে আমি তিনটি পর্যায়ে সাজাতে চাই এবং প্রতিটি পর্যায়ের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে চাই।


প্রথম পর্যায়, অর্থাৎ প্রথম বছরের কাজ হলো ভিত্তি স্থাপন এবং এখানে সবচেয়ে জরুরি কাজটি সবচেয়ে কম আকর্ষণীয় : একটি জাতীয় এআই সক্ষমতা নিরীক্ষা। কোন মন্ত্রণালয়ের হাতে কী ধরনের তথ্য আছে, সেই তথ্য কী অবস্থায় সংরক্ষিত আছে, কোন দপ্তরের প্রযুক্তিগত দক্ষতা কতটুকু এবং কোন সেবায় এআই প্রয়োগের সুযোগ সবচেয়ে বেশি-এসবের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই দাঁড়াতে পারে না। এর সঙ্গে এ বছরেই ফোরামের ভেতরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক সেবা নিয়ে পাঁচটি খাতভিত্তিক কর্মপরিষদ গঠন করা হবে, দেশে ও প্রবাসে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি এআই গবেষক ও পেশাজীবীদের একটি বিশেষজ্ঞ তালিকা তৈরি করা হবে, যাতে প্রয়োজনের সময় সরকার দ্রুত পরামর্শ পেতে পারে, ঝুঁকিভিত্তিক জাতীয় এআই নীতির একটি খসড়া কাঠামো প্রস্তুত করা হবে এবং বাংলা ডেটা কর্পাস নির্মাণের কাজটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথভাবে শুরু করা হবে।


দ্বিতীয় পর্যায়, অর্থাৎ দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরের কাজ হলো নির্মাণ। এ সময়ে বাংলার উপযোগী টোকেনাইজার এবং আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে সূক্ষ্মভাবে প্রশিক্ষিত ছোট আকারের ভাষা মডেল তৈরির কাজ এগিয়ে নিতে হবে, যা কম খরচে দেশের ভেতরেই চালানো সম্ভব হবে। আমি এখানে বিশেষভাবে জোর দিতে চাই কণ্ঠস্বর প্রযুক্তির ওপর, কারণ আমাদের বিপুলসংখ্যক মানুষ লিখতে অভ্যস্ত নন, কিন্তু বলতে পারেন। আর একজন কৃষক বা একজন গৃহিণী যখন নিজের আঞ্চলিক ভাষায় প্রশ্ন করে উত্তর পাবেন, তখনই এআই প্রকৃত অর্থে গণমানুষের প্রযুক্তি হয়ে উঠবে। আর সেজন্য আঞ্চলিক উপভাষার কণ্ঠস্বর সংগ্রহের কাজটিও এ পর্যায়ে করতে হবে। আমি এখানে বিশেষভাবে নারীদের কথা বলতে চাই, কারণ পুরুষের তুলনায় নারীর হাতে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন পৌঁছেছে কম, বিশেষত গ্রামাঞ্চলে। ফলে কণ্ঠস্বরভিত্তিক ও সহজ বাংলার ব্যবস্থাই নারী সমাজের জন্য এ প্রযুক্তির দরজা খুলে দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। আর ঘরে বসে আয়ের সুযোগ তৈরি হলে পরিবারে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও বাড়ে। একই সময় গড়ে তুলতে হবে একটি মূল্যায়ন ভাষায় এআই গবেষণাগার, যেখানে কোনো এআই ব্যবস্থাকে সরকারি সেবায় বসানোর আগে বাংলা ভাষায় ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তার নির্ভুলতা পরীক্ষা করে দেখা হবে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও