তেলের দাম ও হাঁটার উপকারিতা
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার খবর এখন আর নিছক খবর নয়; এটি এমন এক সংবাদ, যার সঙ্গে মানুষ মানসিকভাবে পরিচিত হয়ে গেছে। পত্রিকায় শিরোনাম আসে, মানুষ দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তারপর মোবাইলের ক্যালকুলেটর খুলে বসে। সরকার এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে। ডিজেল এখন ১৩৫, পেট্রল ১৬০, অকটেন ১৬৫ আর কেরোসিন ১৫৫ টাকা। পাম্পে গিয়ে এখন মনে হয়, তেল কিনতে আসিনি—কোনো দুর্লভ খনিজ সম্পদ কিনতে এসেছি। কর্মচারীকে তাই বলতে ইচ্ছে করে, ‘ভাই, আস্তে ঢালেন। এক ফোঁটা মাটিতে পড়লে কিন্তু জাতীয় ক্ষতি হবে!’
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের এক নেতা ফেসবুকে সমালোচনা করেছিলেন। পরে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এরপর ক্ষমতাসীনদের কেউ আর ভুল পথে পা বাড়াননি। এখন সবাই এমন কথাই বলার চেষ্টা করছেন যে, জনগণের কষ্ট আমরা বুঝি। তাই তেলের দাম বাড়িয়ে তাদের হাঁটা-দৌড়ানোর সুযোগ করে দিচ্ছি! হাঁটলে স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, গাড়ি কম চললে যানজট কমবে, আর তেল বাঁচলে দেশের অর্থনীতিও বাঁচবে। অতএব, দাম বাড়ানো আসলে জনগণের স্বার্থেই! এ দেশে যা কিছু হয়, সবই জনগণের স্বার্থে। চালের দাম বাড়ানো হয়েছে ডায়েট করানোর জন্য, ডিমের দাম বাড়ানো হয়েছে প্রোটিনের গুরুত্ব বোঝাতে, আর মাংসের দাম এমন জায়গায় নেওয়া হয়েছে যাতে মানুষ শুধু ছবি দেখেই স্বাদ নিতে পারে।
সরকার হয়তো বলবে, গাড়ি কম চালান, বাসে উঠুন। বাসে উঠলে ভাড়া বাড়বে। তখন বলা হবে, গণপরিবহন ব্যবহার করুন। ভাড়া আরও বাড়লে বলা হবে, সাইকেল চালান। সাইকেলের দাম বাড়লে বলা হবে, হাঁটুন। হাঁটতে গেলে জুতো লাগবে। জুতোর দাম বাড়লে হয়তো বলা হবে, খালি পায়ে হাঁটুন; এতে প্রাকৃতিক চিকিৎসাও হবে। রাস্তায় পিচ গরম থাকলে সেটিকে বলা যেতে পারে হিট থেরাপি। এভাবে এমন অর্থনীতি তৈরি হতে পারে, যেখানে দরিদ্র মানুষের জন্য সবকিছুই থাকবে, শুধু কেনার ক্ষমতাটি থাকবে না।
তেলের দাম বাড়ানোর পেছনে সরকারের যুক্তিও ফেলে দেওয়ার মতো নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আছে, জাহাজভাড়া বেড়েছে। বিপিসি গত মার্চ থেকে আগস্টে ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে। শুধু ডিজেলেই লিটারপ্রতি লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা, দিনে প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। বছরে লোকসান প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। তাই দাম বাড়িয়ে লোকসান কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। অর্থনীতির অঙ্ক পরিষ্কার—বিপিসির লোকসান কমবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জনগণের লোকসান কে কমাবে? বিপিসির হিসাবের খাতা আছে; জনগণের খাতাটা কোথায়?
কারণ তেল শুধু গাড়িতে পোড়ে না। তেল পোড়ে ট্রাকে, বাসে, নৌযানে, সেচপাম্পে, কারখানায়। তারপর সেই পোড়ার খরচ এসে পড়ে বাজারদরের ওপর। সবজির দাম বাড়লে বলা হয় তেলের দাম বেড়েছে। মাছের দাম বাড়লেও একই উত্তর। বাসভাড়া বাড়লেও একই উত্তর। পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লেও একই কথা। একসময় মনে হতে পারে, দেশে কোনো কিছু ঘটলেই উত্তর একটাই—তেলের দাম বেড়েছে। শুধু বৃষ্টি কম হলে বোধহয় বলা হবে, আন্তর্জাতিক বাজারে বৃষ্টির দাম বেড়েছে।
সরকারের আরেকটি যুক্তি হলো, প্রতিবেশী দেশগুলোতে তেলের দাম বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশে দাম কম থাকলে সীমান্তপথে পাচারের ঝুঁকি থাকে। যুক্তিটি শুনে মনে হয়, তেলেরও বুঝি জাতীয় পরিচয়পত্র আছে। বাংলাদেশে জন্মেছে, বাংলাদেশে বড় হয়েছে, তারপর একদিন সীমান্তে গিয়ে বলল—‘আমার ভবিষ্যৎ বিদেশে।’ জ্বালানি পাচার অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। কিন্তু চোরের কারণে সবার বাজারদর বাড়ানো কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নও থাকা দরকার। চোরকে ধরতে হবে, সীমান্ত পাহারা দিতে হবে, পাচারের পথ বন্ধ করতে হবে। নইলে এমন অবস্থা হতে পারে—চোর তেল পাচার করতে পারল না, কিন্তু সাধারণ মানুষ তেল কিনতেই পারল না।
দেশে মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ওপরে। এই অবস্থায় জ্বালানির দাম বাড়ানো অনেকটা জ্বরে আক্রান্ত রোগীকে দেখে বলা, ‘আপনার জ্বর তো আছেই, এবার একটু গরম চা খান।’ জ্বালানির দাম বাড়বে, পরিবহন খরচ বাড়বে, উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, পণ্যের দাম বাড়বে। তারপর আমরা বিস্মিত হয়ে বলব, মূল্যস্ফীতি বাড়ছে কেন? এটি অনেকটা আগুন জ্বালিয়ে বসে আগুনের তাপমাত্রা নিয়ে গবেষণা করার মতো।