যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্ব ও গৃহহীনতার চিত্র
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাথাপিছু বার্ষিক গড় আয় ২ হাজার ৭০০ ডলার, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে মাথাপিছু গড় আয়ের পরিমাণ কমবেশি ৯৫ হাজার ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে মাথাপিছু দ্বিগুণ আয়ের দেশও বিশ্বে রয়েছে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে একইসঙ্গে বড় অর্থনীতি ও শক্তিধর দেশ একটিও নেই। সমগ্র বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাবসম্পন্ন দেশ আর দ্বিতীয়টি নেই। তা সত্ত্বেও দেশটিতে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও বিপুল। এর মধ্যে গৃহহীন মানুষের সংখ্যাও অবিশ্বাস্য। দুটি অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্কে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক গৃহহীন লোকজনের বসবাস। নিউইয়র্ক যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড়, সমৃদ্ধ ও ঘনবসতিপূর্ণ সিটি, যেখানে সরকারি হিসাবে জনসংখ্যা ৮৪ লাখের বেশি; কিন্তু বাস্তবে এক কোটির বেশি লোক বাস করে এ সিটিতে। গৃহহীনরা রাস্তার পাশে ফুটপাতে, উড়াল সেতুর নিচে, সাবওয়ের প্ল্যাটফর্মে, সাগরতীরে ছোট ছোট তাঁবু টানিয়ে, পার্ক ইত্যাদি স্থানে ঘুমায়, বিভিন্ন সেবা সংস্থার সরবরাহ করা খাবার খেয়ে জীবন ধারণ করে। সিটি কর্তৃপক্ষের সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতেও সামান্য কিছুসংখ্যক গৃহহীনের আশ্রয় জোটে, তবে এসব আশ্রয়কেন্দ্র গৃহহীনদের স্থায়ী আবাসের নিশ্চয়তা দেয় না। শীত মৌসুমে গৃহহীনদের যে চরম পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়, তা সীমাহীন। শীতের প্রকোপে অনেকের মৃত্যুও ঘটে এবং ২০২৫ সালে নিউইয়র্ক নগর প্রশাসন ৬৩৪ জন গৃহহীনের মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড করেছে। এর মধ্যে বেশির ভাগের মৃত্যু ঘটেছে শীতকালে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল হাউজিং অ্যান্ড আরবান ডেভেলপমেন্টের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮ লাখ গৃহহীন ছিল, যাদের প্রায় সবাই খোলা আকাশের নিচে ঘুমিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ লাখই নিউইয়র্ক ও ক্যালিফোর্নিয়ায়। দেশটির প্রায় সব রাজ্যে ফুটপাত, পার্কের মতো খোলা স্থানে রাত কাটানো জরিমানাযোগ্য অপরাধ হলেও লস অ্যাঞ্জেলেস, নিউইয়র্কের মতো বড় বড় নগরীতে জনাধিক্যের কারণে গৃহহীন মানুষের বিরুদ্ধে শুধু যেখানে-সেখানে তাদের রাতযাপনের অপরাধে আইন প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না। কারণ সেক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের ওপরই দায়িত্ব বর্তাবে, তারা যাদের ঘুমানোর স্থান থেকে উচ্ছেদ করবে, তাদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করার। কিন্তু লাখ লাখ গৃহহীনের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করার সামর্থ্য কোনো নগর প্রশাসনেরই নেই। নিউইয়র্ক নগর প্রশাসনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে নিউইয়র্কে সাড়ে ৩ লাখ লোক কোনো না কোনো ধরনের গৃহহীনতার মধ্যে ছিলেন। এর একটি বড় অংশ সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ১৫ দিন বা ৩০ দিন কাটালেও বছরের বাকি সময় গৃহহীন অবস্থায় কাটিয়েছে। নগর প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়-নিউইয়র্কের ৬৫ শতাংশ গৃহহীন পরিবারের প্রায় ৩১ হাজার শিশু সদস্য, যারা তাদের গৃহহীনতার কারণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার লাভের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে রয়েছে। গত অর্থবছরের একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নিউইয়র্কে গত শিক্ষাবর্ষে ১ লাখ ৫৪ হাজারের বেশিসংখ্যক স্কুলশিশু বছরের কোনো না কোনো সময়ে গৃহহীনতার মধ্যে কাটাতে বাধ্য হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর গৃহহীনদের আবাসনের ব্যবস্থা করার জন্য ‘হাউজিং ফার্স্ট’ বা ‘সবার আগে আবাসন’ নীতি ঘোষণা করলেও এ লক্ষ্যে তার প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। সেজন্য তার সমালোচকরা তার আবাসন নীতিকে এখন ‘ইনকারসারেশন ফার্স্ট’ বা ‘সবার আগে কারাবাস’ বলে বিদ্রুপ করছে। তাদের মতে, ট্রাম্পের প্রশাসন গৃহহীনদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা দূরের কথা, তাদের অসুখ-বিসুখে জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মতো নিশ্চয়তা পর্যন্ত দিতে পারেনি। পার্ক, সাবওয়ের প্ল্যাটফর্ম, উড়াল সেতুর নিচে বা সমুদ্রসৈকতের মতো সরকারি স্থান থেকে আইন প্রয়োগকারীরা গৃহহীনদের উচ্ছেদ করে তাদের বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও অস্বীকার করছে। এদিক থেকে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর গৃহহীনদের অবস্থার চেয়ে শোচনীয় অবস্থা আমেরিকান গৃহহীনদের। দরিদ্র দেশগুলোর গৃহহীনরা যে কোনো স্থানে যে কোনোভাবে বস্তি গড়ে তোলে; ক্ষমতাসীন দলের গুন্ডা-মাস্তান, পুলিশকে ঘুস দিয়ে যুগ যুগ ধরে সেসব বস্তিতে বসবাস করতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে অনুরূপ সুযোগ না থাকায় কেউ গৃহহীন হয়ে পড়লে তার জীবন সঙ্গীন হয়ে ওঠে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সবার আগে আবাসন’ নীতি সম্পর্কে সিবিএস নিউজের অনলাইন ভার্সনে গত জুলাইয়ে এক রিপোর্টে যা বলা হয়েছিল, তার মর্মার্থ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে গৃহহীনদের বড় অংশকেই বিবেচনা করা হয় এক ধরনের মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত অথবা মাদকাসক্ত হিসাবে। সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে গৃহহীনদের সাময়িক আশ্রয় লাভের সুযোগ পেতে হলেও শর্ত হিসাবে তাদের মাদকাসক্ত মুক্ত হতে হবে, মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হলে চিকিৎসাসেবার নিয়ম মেনে চলতে হবে, তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ থাকতে পারবে না। সাধারণভাবে বলা যায়, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে এমন লোকজনকে স্থান দেওয়ার সুযোগ নেই, যারা অন্যান্য আশ্রিতের জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। আমেরিকান গৃহহীনদের একটি অংশ কর্মহীন নয়; কিন্তু অধিকাংশ দরিদ্র কর্মহীনের পক্ষে তাদের নিজস্ব আবাসনের সংস্থান করার সুযোগ হয় না। বড় বড় নগরীতে আবাসন ব্যয় এত বেশি যে, তাদের সীমিত আয়ে কোনোভাবেই আবাসন ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব নয়। অতএব তারা বাধ্য হয়েই গৃহহীন অবস্থায় কাটায়। তাদের একটি অংশ গাড়িতেও ঘুমায়। এ অংশের চেয়েও যারা হতদরিদ্র, তারা তাঁবুর নিচে ঘুমায়। ভবঘুরেদের স্থান ফুটপাত বা সাবওয়ের প্ল্যাটফর্ম। এ ধরনের গৃহহীনদের অবস্থা এত শোচনীয় যে, তাদের প্রাকৃতিক ক্রিয়াদিরও কোনো ব্যবস্থা নেই, সপ্তাহের পর সপ্তাহ তারা বিনা গোসলে কাটাতে বাধ্য হয়। কিছু মানুষের এহেন মানবেতর জীবনযাপনকে সমালোচকরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কুফল বলে মনে করেন, যেখানে সরকার সামরিক উচ্চাভিলাষ পূরণ করতে বেহিসাবি ব্যয় করে, ব্যয়বহুল প্রকল্পে উন্মত্তের মতো অর্থ ঢালে এবং এর পরিণতি হিসাবে ৮০ শতাংশ আমেরিকান জীবনযাত্রার ন্যূনতম ব্যয় মেটাতে হিমশিম খায় ও চরম আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।