বেকার সমস্যার সমাধানে এখনই উদ্যোগ নিন
শিক্ষাজীবন শেষে প্রত্যেকে যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা করে। কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়া এখন সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা মোটেও কর্মসংস্থানমুখী নয়। বর্তমান সরকার সবার জন্য নৈতিক আদর্শভিত্তিক কর্মসংস্থানমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরে (২০২৬-২৭) শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। এটি মোট জিডিপির ২ শতাংশ এবং বাজেটের ১৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ। শিক্ষামন্ত্রী বিভিন্ন সময় বলেছেন, সরকার আগামী ৫ বছরের মধ্যে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের পরিমাণ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করবে। উল্লেখ্য, ইউনেস্কোর মতে, একটি দেশের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। এ অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গবেষণার কাজে ব্যয়িত হওয়া উচিত।
দেশে এতদিন শিক্ষা খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছিল, তা জিডিপির ২ শতাংশের কম। বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই ব্যয় হতো পরিচালন খাতে (বেতন, ভাতা ও চলতি ব্যয়)। শিক্ষার মানোন্নয়ন ও গবেষণা খাতে ব্যয় হতো ৫ থেকে ১০ শতাংশ। অবশিষ্ট অর্থ ব্যয় হতো ভবন ও ভৌত অবকাঠামো নির্মাণকাজে। অর্থাৎ গবেষণা ও শিক্ষার মানোন্নয়নের বিষয়টি কার্যত অবহেলিত অবস্থায় ছিল। বিগত দিনগুলোতে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট নিয়ে পাশ করার ওপরই বেশি জোর দেওয়া হচ্ছিল। ফলে যারা উচ্চশিক্ষা নিয়ে বেরোচ্ছিল, তাদের একটি বড় অংশই ছিল উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অনুপযুক্ত। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা কার্যত বেকার সৃষ্টি করছিল মাত্র। এখন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে বর্তমান সরকার কর্মমুখী নৈতিক শিক্ষা বিস্তারে কেমন পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তা দেখার জন্য।
সরকার শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়েছে, এটি ভালো উদ্যোগ। তবে বরাদ্দকৃত অর্থ কীভাবে কোথায় ব্যয়িত হবে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা একজন শিক্ষার্থীকে কর্মমুখী এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে গড়ে তুলতে পারে। স্বাধীনতার পর সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর নামে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করা হয়। ফলে আমরা এমন একটি উচ্চশিক্ষিত প্রজন্ম পেয়েছি, যারা কর্মক্ষেত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সক্ষম নয়। আগামীতে সর্বস্তরে শিক্ষা কার্যক্রমে বাংলার সঙ্গে ইংরেজি ভাষার প্রতিও জোর দিতে হবে। একইসঙ্গে আরও একটি বিকল্প ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে একজন শিক্ষার্থী কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে গিয়ে প্রতিযোগিতা করতে পারে। উচ্চ মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারার কারণে একজন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। বাড়ছে কর্মপ্রত্যাশী বেকারের সংখ্যা।
কিছুদিন আগে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে তৃতীয় শ্রেণির একটি পদের জন্য মাস্টার্স ডিগ্রিধারী প্রার্থী আবেদন করেছেন। এ থেকে অনুধাবন করা যায় বর্তমানে চাকরির বাজার কেমন চলছে। দেশে চাকরি এখন আক্ষরিক অর্থেই ‘সোনার হরিণে’ পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেছেন, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে আগামীতে জনসংখ্যা রাষ্ট্রের জন্য বড় বোঝায় পরিণত হবে। বর্তমানে প্রতি চারজন যুবকের মধ্যে একজন বেকার। পাশাপাশি ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীদের ৪০ শতাংশই শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়ে গেছে। নারীর ক্ষেত্রে এ হার ৬০ শতাংশ, যা রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের পথে এক বিরাট প্রতিবন্ধক। কোনো দেশের নির্ভরশীল জনসংখ্যার হারের (১৫ বছরের কম এবং ৬৫ বছরের বেশি) তুলনায় কর্মক্ষম মানুষের (১৫ বছরের বেশি, কিন্তু ৬৫ বছরের কম) হার বেশি হলে সেই অবস্থাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি জাতির জীবনে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ দীর্ঘদিন পরপর আসে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সমস্যা সমাধান
- বেকারত্ব