গণ-অভ্যুত্থান বনাম সামাজিক-রাজনৈতিক ভূকম্পন

যুগান্তর মেজর একেএম শাকিল নেওয়াজ প্রকাশিত: ১২ আগস্ট ২০২৬, ১১:২৩

একটি বড় ভূমিকম্প যখন আঘাত হানে, সাধারণ চোখ প্রথমে দেখে ভেঙে পড়া ভবন, ফাটল ধরা রাস্তা, আর আতঙ্কিত মানুষ। কিন্তু ভূমিকম্পবিজ্ঞান আমাদের বলে, ভূমিকম্পের সূচনা মাটির উপরে নয়। অনেক আগে, অনেক গভীরে, অদৃশ্য চ্যুতিরেখা বা ফল্টের দুই পাশে ধীরে ধীরে জমতে থাকে চাপ। একসময় সেই সঞ্চিত শক্তি সহনসীমা অতিক্রম করলে ঘটে ভাঙন বা Rupture, তারপরই আমরা অনুভব করি কম্পন। আগুনের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। আমরা দেখি শিখা ও ধোঁয়া; কিন্তু অগ্নিবিজ্ঞান বলে, দৃশ্যমান আগুন আসলে পুরো ঘটনার শুরু নয়, বরং একটি চলমান প্রক্রিয়ার বহিঃপ্রকাশ। এর পেছনে থাকে দাহ্য উপাদান, তাপ, অক্সিজেন এবং ধারাবাহিক রাসায়নিক বিক্রিয়া। এ দুই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে ২০২৪-এর জুলাইয়ের ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলনকে পড়লে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি গভীরতর চিত্র সামনে আসে। জুলাইকে শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা হিসাবে দেখলে সম্ভবত এর পূর্ণ শিক্ষা ধরা পড়বে না। এটি ছিল এক ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক ভূকম্পন; যেখানে বহুদিন ধরে সমাজের গভীরে জমে থাকা অসন্তোষ, বৈষম্যের অনুভূতি, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, জবাবদিহির প্রশ্ন এবং ন্যায়সংগত সুযোগের আকাঙ্ক্ষা একপর্যায়ে প্রবল সামাজিক শক্তিতে রূপ নেয়।


চ্যুতিরেখা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু চাপ জমতে থাকে : ভূমিকম্পবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, ভূমিকম্প আকস্মিক মনে হলেও চাপ সঞ্চয় আকস্মিক নয়। ভূগর্ভে চাপ জমার সময় ওপরে জীবন স্বাভাবিকই থাকে। শহর চলে, যানবাহন চলে, ভবন দাঁড়িয়ে থাকে। অথচ অনেক গভীরে শক্তি সঞ্চিত হতে থাকে। সমাজের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা তেমন। তরুণদের একটি অংশ যখন মনে করে তাদের কথা যথেষ্ট শোনা হচ্ছে না, সুযোগ ও বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন যখন জমতে থাকে, প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আস্থার ঘাটতি যখন বাড়ে, প্রতিটি ঘটনাকে আলাদা করে দেখলে সেগুলো ছোট অভিযোগ মনে হতে পারে; কিন্তু বহু ক্ষুদ্র অসন্তোষ একত্রে একসময় সামাজিক চাপের সঞ্চয় তৈরি করতে পারে। ২০২৪-এর কোটা সংস্কারের দাবিও তাই শুধু চাকরির একটি নীতিগত প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি; ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে এটি বৃহত্তর অসন্তোষ প্রকাশের একটি উদ্দীপক বিন্দু হয়ে ওঠে। যখন সঞ্চিত চাপ সহনসীমা অতিক্রম করে, তখন চ্যুতি সরে যায়, শক্তি মুক্ত হয়, মাটি কেঁপে ওঠে। সমাজেও তখন সৃষ্টি হতে পারে শক্তিশালী রাজনৈতিক কম্পন।


অগ্নিরসায়ন দিয়ে জুলাইকে পড়ুন : আগুনের মৌলিক রসায়নে থাকে দাহ্য উপাদান+তাপ+অক্সিজেন+ধারাবাহিক বিক্রিয়া এবং সামাজিক রূপকে জুলাইকে বিশ্লেষণ করলে এ কাঠামোটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দাহ্য উপাদান ছিল জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনার অনুভূতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। তাপ বাড়িয়েছে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও সংঘাত। অক্সিজেন এসেছে জনসম্পৃক্ততা, তরুণদের অংশগ্রহণ, সামাজিক যোগাযোগ ও দ্রুত তথ্যপ্রবাহ থেকে। আর ধারাবাহিক বিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে যখন একটি নির্দিষ্ট দাবি বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করে। অগ্নিবিজ্ঞান এখানেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেয়, ছোট স্ফুলিঙ্গ মানেই ছোট আগুন নয়। পরিবেশে দাহ্য উপাদান আগে থেকেই বিপজ্জনক মাত্রায় জমে থাকলে একটি ছোট স্ফুলিঙ্গও দ্রুত বড় অগ্নিকাণ্ডে রূপ নিতে পারে। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় শুধু ‘আগুন কে ধরাল?’-এ প্রশ্ন করাই যথেষ্ট নয়। আরও গভীর প্রশ্ন করতে হবে-‘এত দাহ্য উপাদান জমতে দেওয়া হলো কেন?’ এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই ভবিষ্যতের সংকট প্রতিরোধের শিক্ষা লুকিয়ে আছে।


মূল কম্পন থামলেই সংকট শেষ হয় না : ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনার একটি বিপজ্জনক ভুল হলো, প্রধান কম্পন থামার পর মনে করা হয় সব শেষ। বাস্তবে এরপরও আসে পরাঘাত বা Aftershock। সামাজিক-রাজনৈতিক ভূকম্পনেরও পরাঘাত থাকে। রাজনৈতিক মেরুকরণ, প্রতিহিংসা, গুজব, সামাজিক বিভাজন, ক্ষমতার নতুন দ্বন্দ্ব, আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা, প্রতিষ্ঠান নিয়ে হতাশা কিংবা নতুন বৈষম্য-সবই হতে পারে সেই পরাঘাতের সামাজিক রূপ। অতএব জুলাইয়ের ঐতিহাসিক মূল্যায়ন শুধু কী ভাঙল বা কে ক্ষমতা হারাল, তার ওপর নির্ভর করবে না। ইতিহাসের আরও বড় প্রশ্ন হবে, কম্পনের পর বাংলাদেশ কী নির্মাণ করল? পুরোনো কাঠামো ভাঙা তুলনামূলক সহজ; কিন্তু ভূমিকম্প সহনশীল নতুন কাঠামো নির্মাণ অনেক কঠিন। আর সেখানেই শুরু হয় একটি জাতির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা পুনর্গঠন।


রাষ্ট্রের এখন প্রয়োজন কাঠামোগত শক্তি বৃদ্ধি : ভূমিকম্পের পর একজন কাঠামো প্রকৌশলী শুধু ফাটলের ওপর রং করেন না। তিনি দেখেন ভিত কতটা শক্ত, স্তম্ভ দুর্বল কি না, ভারবহনব্যবস্থা কার্যকর কি না, সংযোগগুলো টেকসই কি না এবং পরবর্তী কম্পনে ভবনটি দাঁড়িয়ে থাকবে কি না। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই প্রকৌশলভিত্তিক চিন্তা প্রয়োজন। সংবিধান ও আইনের শাসন হলো ভিত্তি; প্রতিষ্ঠানগুলো স্তম্ভ; প্রশাসনিক সক্ষমতা হলো কাঠামোর বাহক; রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক আস্থা হলো সংযোগ; আর ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি হলো সামগ্রিক কাঠামোগত অখণ্ডতা। শুধু রাজনৈতিক মুখ পরিবর্তন করে পুরোনো কাঠামোগত দুর্বলতা রেখে দিলে সেটি অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ওপর নতুন রং দেওয়ার মতো দেখতে নতুন, কিন্তু ঝুঁকি থেকেই যায়। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি বৃদ্ধি তাই শুধু ব্যক্তির পরিবর্তন নয়; প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, আইনের শাসন কার্যকর করা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং নাগরিকের আস্থা পুনর্নির্মাণ করা।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও