অপ্রতিমের মৃত্যুর দায় কার?
একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; কখনো কখনো তা একটি সমাজের আয়না হয়ে ওঠে। অপ্রতিমের মর্মান্তিক মৃত্যু তেমনই একটি ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। কেউ তার বয়সের তুলনায় বড়দের সঙ্গে মেলামেশা, টিকটক ভিডিও কিংবা বাইক ব্যবহারের প্রসঙ্গ টেনে অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। কেউ কেউ আবার এসব আচরণকে সামনে এনে তার মৃত্যুর কারণ ব্যাখ্যা করারও চেষ্টা করছেন। এখানেই আমাদের থামতে হয়। কারণ, একটি শিশুর জীবনযাপন নিয়ে প্রশ্ন তোলা আর তার হত্যার দায় তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া, দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
অপ্রতিমের বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। এ বয়সে একটি শিশুর পৃথিবী গড়ে ওঠার পর্যায়ে থাকে। সে বন্ধু বেছে নেয়, নতুন কিছু জানতে চায়, প্রযুক্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়, বড়দের অনুকরণ করে এবং অনেক সময় নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা ছাড়াই নানা কাজে জড়িয়ে পড়ে। ফলে একজন অভিভাবকের দায়িত্ব অবশ্যই সন্তানের বন্ধু, চলাফেরা, অনলাইন-জগৎ, সামাজিক সম্পর্ক ও মানসিক পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা। একটি দামি ফোন, বাইক চালানোর সুযোগ কিংবা অধিক স্বাধীনতা দেওয়ার সঙ্গে যদি পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা, সীমারেখা ও নিরাপত্তাবোধ না থাকে, তবে সেখানে অভিভাবকদের নতুন করে ভাবার জায়গা আছে। তবে সেই প্রশ্ন কখনোই হত্যার দায়কে হালকা করে না।
অভিভাবকত্ব নিখুঁত কোনো বিজ্ঞান নয়। একজন মা-বাবা সন্তানের প্রতিটি মুহূর্ত পাহারা দিতে পারেন না। উচ্চশিক্ষিত, সচেতন কিংবা প্রতিষ্ঠিত পরিবারের সন্তানও কখনো কখনো এমন কিছু সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা তার বাবা-মা জানেন না। কারণ, কৈশোর এমন এক সময়, যখন সন্তান ধীরে ধীরে নিজের একটি পৃথক জগৎ তৈরি করতে শুরু করে। সেই জগতে প্রবেশের জন্য শুধু শাসন নয়, প্রয়োজন বিশ্বাস, বন্ধুত্ব এবং এমন একটি সম্পর্ক—যেখানে সন্তান ভয় না পেয়ে তার সমস্যার কথা বলতে পারে।
অপ্রতিমের ঘটনায় তাই অভিভাবকত্বের প্রশ্ন থাকলে তা হওয়া উচিত ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষামূলক প্রশ্ন: আমরা কি সন্তানদের শুধু সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছি, নাকি সেই সুযোগ ব্যবহারের নিরাপদ সংস্কৃতিও শেখাচ্ছি? আমরা কি জানি তারা কার সঙ্গে মিশছে? অনলাইনে কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে? তাদের চেয়ে অনেক বড় মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের প্রকৃতি কী? তারা কোনো ভয়, চাপ বা প্রলোভনের মধ্যে আছে কি না? এসব প্রশ্ন সব অভিভাবকের জন্যই প্রাসঙ্গিক। কিন্তু এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে ‘কোনো শিশুর আচরণই তাকে হত্যার যোগ্য করে তোলে না’—এই মৌলিক সত্যটি যেন কোনোভাবেই হারিয়ে না যায়।
এই জায়গায় তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর কথা মনে পড়ে। ত্বকী টিকটক করত না, বাইক চালিয়ে ঘুরত না, কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে মিশত না। সে লিখত, কবিতা পড়ত, ছবি আঁকত। অসাধারণ মেধাবী এই কিশোরের মৃত্যুর পর প্রকাশিত তার এ লেভেল পরীক্ষার ফল তো ছিল রীতিমতো ঈর্ষণীয়। ২০১৩ সালের মার্চে নিখোঁজ হওয়ার পর তার মরদেহ শীতলক্ষ্যা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। তার হত্যাকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিচার ও জবাবদিহির দাবি রয়েছে।
ত্বকীর কথা মনে করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য কাউকে রাজনৈতিকভাবে দায়ী করা নয়; বরং একটি বিপজ্জনক সামাজিক যুক্তির অসারতা বোঝানো। যদি বলা হয়—‘খারাপ জীবনযাপন’ হত্যার কারণ, তাহলে ‘ভালো জীবনযাপনকারী’ একজন কিশোর কেন হত্যার শিকার হলো? আসলে হত্যার কোনো ‘ভালো ছেলে’ বা ‘খারাপ ছেলে’ সংস্করণ নেই। হত্যার দায় হত্যাকারীর। ভুক্তভোগীর পোশাক, অভ্যাস, বন্ধু, সামাজিক অবস্থান, প্রযুক্তি ব্যবহার কিংবা জীবনযাপনকে সামনে এনে হত্যার নৈতিক বৈধতা তৈরি করা যায় না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শিশু হত্যা