মূল্যস্ফীতি কমছে, তবুও কেন বাজারে মিলছে না স্বস্তি?

বিডি নিউজ ২৪ এম এম মুসা প্রকাশিত: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৪

গত এক বছরে বাংলাদেশের সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতির হার ধারাবাহিকভাবে ওঠানামা করেছে—কখনো ৮ শতাংশের ঘরে, কখনো সাড়ে ৯ শতাংশ ছুঁয়ে। জুন মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.০৬ শতাংশ থেকে কমে ৮.৬০ শতাংশে নেমেছে বলে বিবিএসের তথ্য বলছে। কিন্তু ভোক্তা পর্যায়ে এই `হ্রাস’-এর অভিজ্ঞতা প্রায়শই বিপরীত—কাঁচাবাজারে গিয়ে ক্রেতা দেখেন সবজি, মাছ বা ভোজ্যতেলের দাম কমেনি; কোনো কোনো পণ্যে তা আরও বেড়েছে। এই বৈপরীত্য নিছক পরিসংখ্যানগত বিভ্রম নয়; গভীরতর কাঠামোগত সমস্যার একটি লক্ষণ, যা প্রচলিত মুদ্রানীতি-কেন্দ্রিক বিশ্লেষণে প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়।


আন্তর্জাতিক তত্ত্ব: ‘সেলার্স ইনফ্লেশন’ ও মূল্য-নির্ধারণ ক্ষমতা


২০২০ সাল পরবর্তী বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি পর্যালোচনা করতে গিয়ে ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ইসাবেলা ওয়েবার এবং তার সহলেখকরা একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হাজির করেন, যা ‘সেলার্স ইনফ্লেশন’ নামে পরিচিতি পায়। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সরবরাহ শকের (supply shock) সময়ে যেসব খাতে বাজার কাঠামো অপেক্ষাকৃত কম প্রতিযোগিতামূলক, সেসব খাতের বিক্রেতারা কেবল বর্ধিত ব্যয় ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেন না, সংকটকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে মুনাফার হারও বাড়িয়ে নেন। এই তত্ত্বের মূল প্রতিপাদ্য হলো, সরবরাহ শক প্রাথমিক ট্রিগার হিসেবে কাজ করলেও তার পরবর্তী তীব্রতা ও স্থায়িত্ব অনেকাংশে নির্ধারিত হয় বাজারের কাঠামোগত প্রতিযোগিতাহীনতার দ্বারা—যেখানে অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠান বা মধ্যস্বত্বভোগী মূল্য-নির্ধারণে প্রাধান্য বিস্তার করে। এই কাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গি মিল্টন ফ্রিডম্যানের নিছক চাহিদা-সরবরাহ ভারসাম্যের প্রচলিত মডেল থেকে ভিন্ন—এটি জোর দেয় বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক গঠন ও ক্ষমতার অসমতার ওপর।


বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই তত্ত্বীয় কাঠামো প্রয়োগ করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—দেশের কৃষিপণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের কাঠামো আদৌ প্রতিযোগিতামূলক কিনা। এখানে লক্ষণীয় যে বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) নিয়মিতভাবে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে বাজারদর পর্যালোচনা প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও এই প্রতিবেদনগুলো মূলত মূল্যের ওঠানামা নথিভুক্ত করে—উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত মূল্য-শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে কার হাতে কতটা মুনাফা যাচ্ছে তার কাঠামোগত বিশ্লেষণ এতে থাকে না।


বাংলাদেশের সরবরাহ শৃঙ্খল: আড়তদার-মধ্যস্বত্বভোগী কাঠামোর ভূমিকা


বাংলাদেশের কৃষিপণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার একটি সুপরিচিত বৈশিষ্ট্য হলো উৎপাদক ও চূড়ান্ত ভোক্তার মধ্যে বহুস্তরীয় মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতি—পাইকারি আড়তদার, কমিশন এজেন্ট, স্থানীয় ফড়িয়া এবং খুচরা বিক্রেতা। প্রতিটি স্তরে সংযোজিত মুনাফার প্রকৃত পরিমাণ নিয়মিতভাবে স্বাধীন গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা বাংলাদেশে এখনো দুর্বল। কারওয়ান বাজারের মতো কেন্দ্রীয় পাইকারি বাজারগুলোতে সীমিতসংখ্যক আড়তদারের হাতে নির্দিষ্ট পণ্যের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত থাকার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য বিশ্লেষকদের আলোচনার বিষয়। এই কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য অর্থনীতিবিদ স্টিগলিৎজের তথ্য-অসমতা (information asymmetry) তত্ত্বের একটি বাস্তব প্রয়োগক্ষেত্র তৈরি করে—যেখানে বাজারের এক পক্ষ (এক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীরা) মূল্য ও সরবরাহ সম্পর্কে অন্য পক্ষের (কৃষক ও ভোক্তা) তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি তথ্য ও দর-কষাকষির ক্ষমতা রাখে, যা বাজারকে দক্ষতার পরিবর্তে ক্ষমতার ভিত্তিতে পরিচালিত করে।


এই কাঠামোগত সমস্যা সরকারি হস্তক্ষেপ ব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও সীমিত করে দেয়। টিসিবি কার্ডধারী পরিবারগুলোর মধ্যে ভর্তুকি মূল্যে ভোজ্যতেল, চিনি, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করে, যা বাজারদরের তুলনায় ৩০-৪০ শতাংশ কম দামে সরবরাহকৃত বলে দাবি করা হয়। কিন্তু এই কর্মসূচির কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা হলো—এটি খোলা বাজারের মূল্য-নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত না করে কেবল একটি সমান্তরাল, সীমিত-পরিসরের বিকল্প বাজার তৈরি করে। ফলে খোলা বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের মূল্য-নির্ধারণ ক্ষমতা অক্ষত থেকে যায়, আর টিসিবির কর্মসূচি মূল সমস্যার সমাধান না করে কেবল তার প্রভাব আংশিকভাবে প্রশমিত করে—তাও শুধু কার্ডধারী পরিবারগুলোর জন্য, যা মোট ভোক্তা জনগোষ্ঠীর একটি সীমিত অংশ।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও