ইসিএ বনাম রামসার নীতিমালা: বিপরীতধর্মী দুই নীতির চাপে টাঙ্গুয়ার হাওর

বিডি নিউজ ২৪ রাসেল আহমদ প্রকাশিত: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪১

১৯৯৯ সালের ১৯ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরকে 'প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা' বা ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করে। ঠিক এর পরের বছর, ২০০০ সালের ২০ জানুয়ারি, আন্তর্জাতিক মঞ্চে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় 'রামসার সাইট' হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি পায়। অসাধারণ জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত গুরুত্বের কারণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে টাঙ্গুয়ার হাওর এক অনন্য মর্যাদা লাভ করে। তবে এই স্বীকৃতির সিকি শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও হাওরটির টেকসই সংরক্ষণ এবং আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোর সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নিয়ে চলমান বিতর্কের অবসান ঘটেনি; বরং সম্প্রতি ওই বিতর্ক আরও তীব্র রূপ নিয়েছে।


বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে প্রণীত 'টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা আদেশ-২০২৫'-এর আলোকে সম্প্রতি সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন পরিবেশ রক্ষা ও স্থানীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ১৩ দফার এক জরুরি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে। এতে নির্দেশনা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তির মূল বক্তব্য অনুযায়ী, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইসিএ ঘোষিত সীমানায় পর্যটকবাহী যে কোনো নৌযান ও হাউসবোটের প্রবেশ ও চলাচল সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত ও ক্ষেত্রবিশেষে নিষিদ্ধ থাকবে। হাওরের অভ্যন্তরীণ সংরক্ষিত অংশে প্রবেশ করতে হবে হস্তচালিত নৌকায়। একই সঙ্গে, নিবন্ধনের শর্ত আরোপসহ রাত ১০টার পর উচ্চস্বরে গান-বাজনা, মাইক বা সাউন্ডসিস্টেম ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।


প্রশাসনের এই পদক্ষেপের পর স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশবাদী ও বিশেষজ্ঞ মহলে নতুন করে আইনি কাঠামোর অস্পষ্টতা নিয়ে সমালোচনা জোরাল হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি নীতিমালায় টাঙ্গুয়ার হাওরের ইসিএ সীমানা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিতকরণে চরম অস্পষ্টতা রয়েছে। মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওরের সংকটাপন্ন এলাকা যেভাবে ভৌগোলিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, টাঙ্গুয়ার ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। ফলে প্রতিবছর পর্যটন মৌসুমে কঠোর বিধিনিষেধের গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হলেও বাস্তবায়নের অভাবে তা 'কাগুজে আদেশে' পরিণত হয়। ফলশ্রুতিতে হাওরের পরিবেশগত প্রকৃত সুরক্ষা কিংবা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কোনোটিই অর্জিত হচ্ছে না।


ভৌগোলিকভাবে টাঙ্গুয়ার হাওর প্রকৃতির এক অনবদ্য সৃষ্টি। সুরমা-কুশিয়ারা নদী অববাহিকায় এর অবস্থান হলেও এটি কোনো প্রথাগত নদীর চলমান স্রোতে গঠিত নয়; বরং মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে প্রায় ১১ হাজার একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এক মুক্ত জলরাশির জীবন্ত রূপ। যাদুকাটা, পাটলাই ও বৌলাই নদী হয়ে সুরমা পর্যন্ত বিস্তৃত মৎস্য অভিবাসন পথ প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি। প্রায় ৩০টি পাহাড়ি ছড়া (খাল) দিয়ে নেমে আসা স্বচ্ছ পানি এখানে প্রবাহিত হয়, যা তুলনামূলক কম পলি বহন করে। বহু বছরের অলঙ্ঘনীয় নির্জনতায় এখানে গড়ে উঠেছে নিবিড় হিজল-করচ ও নলখাগড়ার প্রাকৃতিক বনাঞ্চল, যা দেশীয় মাছের অভয়ারণ্য এবং শীত মৌসুমে দূর-দূরান্ত থেকে আসা লাখ লাখ অতিথি পাখির নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়। মূলত এই ১১ হাজার একরের জলাভূমি সমগ্র বাংলাদেশের মিঠাপানির মৎস্যসম্পদের অন্যতম প্রধান প্রজননক্ষেত্র।


বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, কার্বন নিঃসরণ ও পরিবেশ ধ্বংসের ফলে পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্র এক মারাত্মক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতিসংঘ, আইইউসিএন ও রামসার ব্যুরোর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিশ্বব্যাপী সমন্বিত পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ পরিচালনা করছে। বাংলাদেশ সরকারও ১৯৯৫ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন করে এবং ওই আইনের সূত্র ধরেই ১৯৯৯ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরকে ইসিএ ঘোষণা করে। তবে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের কঠোর ও কেবল নিষেধাজ্ঞামূলক ধারা কার্যকর রেখে কোনো দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার বা স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। কারণ 'ইসিএ' এবং 'রামসার সাইট' দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিপরীতমুখী দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করে।


রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর একই জলাভূমিতে ইসিএ-এর আইনি নিষেধাজ্ঞা চাপানোকে পরিবেশবিজ্ঞানীরা নীতিগত ও আমলাতান্ত্রিক অদূরদর্শিতা হিসেবে উল্লেখ করেন। এটি অনেকটা মহান বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের ওই রসাত্মক গল্পের মতো, যেখানে বড় ও ছোট বিড়ালের যাতায়াতের জন্য একই দরজায় দুটি আলাদা গর্ত করা হয়েছিল! প্রকৃতপক্ষে রামসার কনভেনশন কোনো প্রাকৃতিক জলাভূমিকে মানববিচ্ছিন্ন বা অবরুদ্ধ করে রাখার কথা বলে না; বরং এটি আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে 'ওয়াইজ ইউজ' বা 'বুদ্ধিভিত্তিক টেকসই ব্যবহার'-এর নীতিকে প্রাধান্য দেয়।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও