যে কারণে ‘আদিবাসী’ শব্দটি বাংলাদেশে বিতর্কিত
প্রতি বছর ৯ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয় International day of the world's indigenous peoples বা বিশ্ব আদিবাসী দিবস। জাতিসংঘ ১৯৯৪ সালে দিবসটি চালু করে, যার উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের ঐতিহাসিকভাবে বঞ্চিত, প্রান্তিক ও সাংস্কৃতিকভাবে স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠীর অধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি ও ভূমির প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরা। লাতিন আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা কিংবা নিউজিল্যান্ডে এ দিবস সাধারণত ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি এবং অধিকার রক্ষার প্রশ্নে পালিত হয়।
কিন্তু বাংলাদেশে এ দিবসটি বিতর্ক, বিভাজন এবং তীব্র মতবিরোধের জন্ম দেয়। ‘আদিবাসী’, ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’, ‘নৃ-সম্প্রদায়’ কিংবা ‘সেটেলার’ শব্দগুলো কেবল ভাষাগত পরিভাষা না হয়ে রাজনৈতিক সংঘাতের উপাদানে পরিণত হয়। বিশেষত, পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংঘাতের পটভূমিতে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে সামাজিক-সাংস্কৃতিক-জাতিগত বিভাজনের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে এসব শব্দ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটি কেবল একটি নৃতাত্ত্বিক পরিভাষা নয়। ইতিহাস, পরিচয়, সংবিধান, আন্তর্জাতিক আইন এবং ভূরাজনীতির সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি জটিল রাজনৈতিক বিতর্ক। বিতর্কের মূল ইস্যু হলো-আন্তর্জাতিক পরিসরে ‘Indigenous peoples’ ধারণার যে ঐতিহাসিক ও আইনগত ভিত্তি রয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাষ্ট্রগঠনের বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ঐতিহাসিকভাবে লক্ষ করা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলের প্রশাসনিক দলিল, বিশেষ করে Chittagong hill tracts regulation, 1900, পাকিস্তান আমলের সরকারি নথিপত্র কিংবা স্বাধীন বাংলাদেশের আইন ও প্রশাসনিক দলিলগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ (Indigenous) হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়নি। একইভাবে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তিতেও ‘আদিবাসী’ শব্দটির কোনো উল্লেখ নেই। সেখানে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার, আঞ্চলিক পরিষদ, ভূমি কমিশন, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণসহ বিভিন্ন বিষয় স্থান পেলেও 'Indigenous peoples’ই ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশের সংবিধানও এ ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’, ‘নৃগোষ্ঠী’ ও ‘সম্প্রদায়’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে; ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক আইনগত ভাষ্য এবং ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ব্যবহারের দিক থেকে ‘আদিবাসী’ শব্দের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।
প্রশ্ন হলো, তাহলে ‘আদিবাসী’ শব্দটি কীভাবে দৃশ্যপটে এসে গেল? কেন আকস্মিকভাবে ‘আদিবাসী’ শব্দটিকে কোনো কোনো গোষ্ঠীর পক্ষে জোরালো আলোচনায় টেনে আনা হচ্ছে? অনেক গবেষকের মতে, ১৯৮০-এর দশক থেকে বিশেষ করে জাতিসংঘের Indigenous peoples-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী হওয়ার পর বাংলাদেশেও পাহাড়িদের ‘আদিবাসী’ পরিচয়ে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালানো শুরু হয়। কারণ, এ পরিচয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো, জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরাম এবং বৈশ্বিক অ্যাডভোকেসি নেটওয়ার্কে নিজেদের অবস্থান আরও দৃশ্যমান করার সুযোগ নিতে চায় সংশ্লিষ্টরা।
সমালোচকদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্য একটি পরিভাষাকে বাংলাদেশের ভিন্নতর ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক বাস্তবতায় সরাসরি প্রয়োগ করলে ধারণাগত বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে। তাদের যুক্তি, বাংলাদেশের অধিকাংশ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক আগমন বিভিন্ন সময়ে পার্শ্ববর্তী অঞ্চল-বিশেষত আরাকান, ত্রিপুরা ও বর্তমান মিয়ানমারের পার্বত্য এলাকা থেকে হয়েছে বলে ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। ফলে ‘প্রথম অধিবাসী’ অর্থে আন্তর্জাতিক আদিবাসী ধারণা এখানে সরাসরি প্রযোজ্য কিনা, তা প্রশ্ন ও বিতর্কসাপেক্ষ।