পরিবেশ সংকটজনিত দুর্যোগ ও করণীয়
বর্তমানে পরিবেশ সংকটজনিত দুর্যোগ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইউরোপের স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল, গ্রিসসহ বিভিন্ন দেশে নজিরবিহীন দাবানলে লাখ লাখ হেক্টর বনভূমি পুড়ে যাওয়া, মানুষের মৃত্যু এবং বিপুলসংখ্যক মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় বহু মানুষ উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কিত।
এই লেখাটি তৈরির তারিখে (২৮ জুলাই ২০২৬) স্পেন ও ফ্রান্সের একাধিক এলাকায় দাউদাউ করে জ্বলছে দাবানল। কানাডায় শত শত দাবানল এ বছর অনেক দিন ধরে জ্বলেছে এবং এর ধোঁয়া সীমান্ত অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বায়ুমানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। উত্তর গোলার্ধের অনেক দেশে তীব্র তাপপ্রবাহের তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে জনস্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও পানির চাহিদার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। পৃথিবীর অনেক জায়গায় দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে বহু এলাকায় নদী কিংবা জলাশয়ের পানি কমে যায়, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং বনভূমি দাবানলের জন্য আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
‘ইমার্জেন্সি ইভেন্টস ডেটা বেইস’-এর ২০২৬ সালের (২৮ জুলাই পর্যন্ত) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী বন্যা ও বৃষ্টিজনিত ভূমিধসকেন্দ্রিক ৩৬টি দুর্যোগ সংঘটিত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে অনেক মানুষের। এ ছাড়া এই ডেটা বেইসে তীব্র আবহাওয়াজনিত ঝড়, উষ্ণমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়, তুষারঝড়, বজ্রঝড় ও টর্নেডো—সব মিলিয়ে মোট ৫৮টি বড় ধরনের ঝড়ের পরিসংখ্যানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রিলিফওয়েব এবং জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয়ের প্রতিবেদনে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভারতসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার বহু দেশে সংঘটিত বন্যা ও ভূমিধসের কারণে মানবিক সংকটের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
চলতি বছরে একাধিক মহাদেশে সংঘটিত হয়েছে বন্যা, ভূমিধস ও ঝড়। এসবের ব্যাপকতা এবং মানবিক প্রভাব সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ক্রমবর্ধমান চরম বৃষ্টিপাত ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ‘আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেল’-এর ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মূল্যায়নে বলা হয়েছে যে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বিশ্বের বহু অঞ্চলে তীব্র দুর্যোগের ঘটনা ঘন ঘনই ঘটছে।
তাপপ্রবাহ, খরা, দাবানল, ঝড়, বন্যা ও বৃষ্টিজনিত ভূমিধসের ঘটনাবলি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে বৈশ্বিক পরিবেশ সংকট ক্রমেই আরো গভীর ও জটিল রূপ ধারণ করছে। ‘স্টেট অব দ্য গেস্নাবাল ক্লাইমেট (এসওটিজিসি)’ ২০২৫ (প্রকাশিত ২০২৬) এবং ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’ (২০২৫/২০২৬)-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন উপরোক্ত দুর্যোগগুলোর ঘনত্ব, তীব্রতা এবং অনেক ক্ষেত্রে সংঘটনের আশঙ্কা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করছে।
এসওটিজিসি উল্লেখ করেছে, ২০২৫ সালে পৃথিবীর বার্ষিক গড় পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পযুগের (ভিত্তিকাল ১৮৫০-১৯০০) গড়ের তুলনায় প্রায় ১.৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল এবং ২০২৩-২০২৫ সময়কালের সমন্বিত গড় উষ্ণতা প্রায় ১.৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল। বিশেষজ্ঞরা উপরোক্ত দুর্যোগসংক্রান্ত পরিসংখ্যানগুলোকে মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ধারাবাহিক তীব্রতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
প্রায় তিন দশক ধরে বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকরা বৈশ্বিক উষ্ণায়নজনিত দুর্যোগ মোকাবেলায় জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত হ্রাস, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো, জলবায়ুসহনশীল কৃষি গড়ে তোলা, বন ও প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ, জলবায়ুসহিষ্ণু নগর উন্নয়ন, কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অর্থায়ন বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছেন। তবে বর্তমানে কয়েকটি বিষয়ে নতুন করে বিশেষভাবে জোর দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—পজিটিভ টিপিং পয়েন্ট (নবায়নযোগ্য শক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন বা পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার এমন পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া, যেখানে এগুলোর বিস্তার স্বয়ংক্রিয়ভাবে দ্রুত বৃদ্ধি পায়), রূপান্তরমূলক অভিযোজন (শুধু বাঁধ বা প্রতিরক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ নয়, প্রয়োজনে নগর, উপকূলীয় বসতি ও কৃষি ব্যবস্থার মৌলিক পুনর্বিন্যাস), চরম তাপপ্রবাহকে একটি স্বতন্ত্র জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া (তাপপ্রবাহ মোকাবেলায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা, কর্মপরিবেশ ও নগর পরিকল্পনা নতুনভাবে সাজানো), দুর্যোগ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে আগাম প্রস্তুতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, এল নিনো ও মানবসৃষ্ট উষ্ণায়নের যুগপৎ প্রভাবের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি এবং জলবায়ুব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ টিপিং পয়েন্ট (জলবায়ুব্যবস্থার এমন একটি সীমা, যা অতিক্রম করলে দ্রুত ও অনেক ক্ষেত্রে অপরিবর্তনীয় পরিবর্তন শুরু হয়) অতিক্রম না করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ।
২০২৬ সালের জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত প্রাপ্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর বৃক্ষাচ্ছাদিত ভূমি দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে অন্যান্য দেশও (রাশিয়া, চিলি, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক ইত্যাদি) দাবানলের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, যদিও এসব দাবানলে ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে এখনো কোনো পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়নি। ‘গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ’-এর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ ও ২০২৪ সালে বিশ্বের যথাক্রমে (প্রায়) ২.৮৬ কোটি ও তিন কোটি হেক্টর বৃক্ষাচ্ছাদিত ভূমি দাবানলের শিকার হয়েছে।