ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক পুনর্গঠন

যুগান্তর ড. মাহফুজ পারভেজ প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:০০

ঢাকা-দিল্লি তথা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে এখন শুধু কূটনৈতিক টানাপোড়েন হিসাবে দেখলে বাস্তবতাকে অনেকটাই ছোট করে দেখা হবে। এটি একইসঙ্গে একটি ভূরাজনৈতিক, ভূঅর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক সম্পর্কের রসায়ন। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তার প্রত্যর্পণের প্রশ্ন, তার ভারত থেকে দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর-সম্পর্কের পুরো কাঠামো নয়, রাজনৈতিক উপাদান মাত্র।


দুই দেশের সম্পর্কের প্রকৃত ভিত্তি হলো জাতীয় স্বার্থ, ভূগোল, সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা, জ্বালানি, অভিবাসন, বঙ্গোপসাগর এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা। কোনো ব্যক্তি বা একটি সফর এসব কাঠামোগত বাস্তবতাকে অতিক্রম করতে পারে না। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের প্রায় ৪,১০০ কিলোমিটারের স্থলসীমান্ত, অভিন্ন নদী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, ট্রানজিট এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে সংযোগ-এসবই এমন বাস্তবতা, যা জাতীয় স্বার্থের নিরিখে নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন।


ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ-এবং রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বিচার, সার্বভৌমত্ব এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি আইনি, কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক বিবেচনার বিষয়। ফলে এখানে আবেগের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও আইনি কাঠামো কাজ করছে।


উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, হাসিনা ইস্যুতে ঢাকার অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়। ফলে এ ইস্যুটি বারবার সম্পর্কের ক্ষেত্রে সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে, যা ভারতকে সন্তোষজনক জবাব দেওয়ার মাধ্যমে প্রশমিত করতে হবে। হাসিনা প্রশ্নে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট না হলে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে ভারতের কূটনৈতিক পরিসর সংকুচিত হতে থাকবে।


তাছাড়া, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। একটি সফর কিছুটা বরফ গলাতে পারে। তবে বরফ পুরোপুরি গলার জন্য তার নিচে থাকা সমস্যাগুলোও মোকাবিলা করতে হয়। উচ্চপর্যায়ের সফর কূটনীতিতে প্রতীকী ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সফরের আগে ও পরে যদি পানি, বাণিজ্য, সীমান্ত, নিরাপত্তা, প্রত্যর্পণ, যোগাযোগ-এসব বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি না হয়, তাহলে সফরটি ছবির সুযোগ সৃষ্টি করবে, সম্পর্কের কাঠামোগত পরিবর্তন আনবে না। সুতরাং সফরকে লক্ষ্য না বানিয়ে ফলাফলকে লক্ষ্য করা উচিত। কূটনীতির ইতিহাসে একটি শিক্ষা আছে-সফর সম্পর্ক তৈরি করে না; সম্পর্কের রাজনৈতিক ফলাফলকে দৃশ্যমান করে।


বলার অপেক্ষা রাখে না, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা পানিবণ্টন। গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের শেষে পুনর্নবীকরণের প্রশ্নে পৌঁছাচ্ছে। একইসঙ্গে তিস্তা সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত। এ দুটি নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্প-যা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত উদ্বেগের আরেকটি মাত্রা যোগ করেছে। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি ছিল বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি মাইলফলক। এ চুক্তির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ফারাক্কা বাঁধে উভয় দেশের মধ্যে পানিবণ্টনের একটি সুনির্দিষ্ট সূত্র নির্ধারিত হয়। চুক্তির মূল বৈশিষ্ট্য হলো-প্রতি দশকে পুনর্নবীকরণের বিধান, যার প্রথম পুনর্নবীকরণ হয় ২০০৬ সালে এবং দ্বিতীয়টি ২০১৬ সালে। বর্তমানে চুক্তির তৃতীয় পুনর্নবীকরণের সময়সীমা ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে এসে পৌঁছাচ্ছে। এ পুনর্নবীকরণ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা কেবল আইনি প্রশ্ন নয়; এটি দুই দেশের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার প্রশ্ন। কারণ গঙ্গা শুধু একটি নদী নয়-এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের সঙ্গে যুক্ত। তাছাড়া, চুক্তির পুনর্নবীকরণ শুধু কারিগরি বিষয় নয়; এটি দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সদিচ্ছারও পরীক্ষা। কারণ গঙ্গার পানির প্রবাহ ঋতুভিত্তিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ প্রবাহ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে চুক্তির পুনর্নবীকরণকে কেবল আইনি প্রক্রিয়া হিসাবে নয়, বরং একটি কৌশলগত সংলাপ হিসাবে দেখা উচিত।


গঙ্গার তুলনায় তিস্তা সমস্যা আরও জটিল। তিস্তা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী, যা রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা অঞ্চলের কৃষি ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। ১৯৮৩ সালে তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তির একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি হয়েছিল, যা ২০১১ সালে প্রায় স্বাক্ষরের পর্যায়ে পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত সই হয়নি। বাংলাদেশের জন্য তিস্তার পানি কেবল কৃষির জন্য নয়; এটি নদীর প্রবাহ বজায় রাখা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা এবং মরুকরণ প্রতিরোধের প্রশ্ন। তিস্তার পানি না পেলে উত্তরাঞ্চলে খরা ও মরুকরণের ঝুঁকি বাড়ে, যা সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও