শিশুর শৈশব ও জীবন রক্ষা হোক আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়
‘দশ মাস দশ দিন ধরে গর্ভধারণ…’—জেমসের কণ্ঠে গাওয়া এই গানটি শুনে বড় হয়েছি। তবে গানটির মর্মার্থ গভীরভাবে বুঝতে পেরেছি নিজে গর্ভধারণ করার পর। তখন উপলব্ধি করেছি, একজন মায়ের জন্য গর্ভকাল কতটা গুরুত্বপূর্ণ, কতটা উদ্বেগ, অপেক্ষা ও ভালোবাসায় পূর্ণ। মা-বাবা এবং তাদের পরিবারের সবাই অনাগত শিশুর আগমনের পথ চেয়ে থাকেন। তাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া ভবিষ্যতের পৃথিবীকে গড়ে তোলার মানুষটি যেন পৃথিবীর বুকে নিরাপদে ভূমিষ্ঠ হয়।
প্রতিটি শিশুর জন্মের সঙ্গে একটি পরিবারের স্বপ্নেরও জন্ম হয়। সেই স্বপ্নে থাকে শিশুর নিরাপদে বেড়ে ওঠা, ভেজালমুক্ত খাবার, নিরাপদ সড়ক ও বাসস্থান, নিশ্চিন্ত ঘুম, সময়মতো সুচিকিৎসা এবং ভবিষ্যতের পৃথিবী গড়ার প্রস্তুতি হিসেবে সুশিক্ষা। এই স্বপ্নের সঙ্গে শুধু একটি পরিবারের নয়, একটি দেশের ভবিষ্যৎও জড়িয়ে থাকে।
আজকের শিশুই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিল্পী, কৃষিবিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা কিংবা রাষ্ট্রনায়ক। তাই শিশুর নিরাপত্তা কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত উদ্বেগ নয়; এটি একটি জাতির উন্নয়ন এবং সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর অস্তিত্ব ও অগ্রযাত্রার ভিত্তি।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে বিভিন্ন সময় এমন অনেক ঘটনা ও দুর্ঘটনা ঘটে, যেখানে শিশুদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। কখনো সড়ক দুর্ঘটনা, কখনো পানিতে ডুবে মৃত্যু, কখনো হাম বা অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব, কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা জনসমাগমস্থলে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা, প্রতিটি ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে আরও সুপরিকল্পিতভাবে এগোনোর প্রয়োজন রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা, যার মধ্যে মাইলস্টোন স্কুলের ঘটনাও রয়েছে, আমাদের আবারও ভাবতে বাধ্য করেছে, আমরা কি শিশুদের বেড়ে ওঠার জন্য এ দেশে যথেষ্ট নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে পেরেছি?
এ ধরনের ঘটনার পর আমরা প্রায়ই দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের খোঁজ করি। জবাবদিহিতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু দায় নির্ধারণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা, ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, নিরাপদ নগর পরিকল্পনা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোরতা এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, সবকিছুকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হলো প্রতিটি দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং সেই শিক্ষাকে নীতিমালা, অবকাঠামো ও দৈনন্দিন চর্চায় রূপ দেওয়া। শুধু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেই হবে না; সিদ্ধান্তগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তারও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রয়োজন।
বিবেচনায় রাখতে হবে, শিশুর নিরাপত্তা কোনো একক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সড়ক পরিবহন, নগর পরিকল্পনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠান সবাইকে নিয়ে এটি একটি সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ।
আমরা যদি শিশুদের নিরাপত্তাকে বিচ্ছিন্ন কিছু দুর্ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখি, তাহলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বরং শিশু নিরাপত্তাকে একটি জাতীয় সংস্কৃতিতে পরিণত করতে হবে। রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্ব যখন শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও কল্যাণকে দৃশ্যমানভাবে অগ্রাধিকার দেয়, তখন তা প্রশাসন ও সমাজের জন্য একটি শক্তিশালী ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শৈশব কাল
- শিশু পালন
- জীবন রক্ষা