জুলাই প্রজন্মের রাজনীতিকে কীভাবে দেখব
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে এর সফলতা–ব্যর্থতা নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। এ কথা সত্য, গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দুঃশাসন অপসারিত হয়েছে। তবে পরিশুদ্ধ শাসনের সুবাতাস এখনো বইতে শুরু করেনি। আমাদের সামষ্টিক দুঃসহ অতীত মারা গেছে, কিন্তু চমৎকার বর্তমান এখনো পায়নি। এমনকি জুলাই গণ-আন্দোলন যে ভবিষ্যতের আশা জাগিয়েছিল, তা–ও বর্তমানের ভেতর এসে যেন খাবি খাচ্ছে।
এ প্রবণতাকে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ দিপেশ চক্রবর্তী ‘বর্তমানসর্বস্বতা’ বলে অভিহিত করেছেন। রাজনৈতিকভাবে আমরা আছি তাৎক্ষণিকতার ভেতর। এ তাৎক্ষণিকতার কারণে আমাদের সার্বিক জাতীয় স্মৃতি গড়ে উঠছে না।
ফলে এ প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, জুলাই চেতনার গর্ভে যে পরিশুদ্ধ রাজনৈতিক সত্তা জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা ছিল তা কতটা আলোর মুখ দেখতে পেয়েছে? গত দুই বছরে পেছনের দিকে ফিরে তাকালে মনে হতে পারে, জনগণ জুলাই নেতৃত্বকে চওড়া সড়কে তুলেছিল, কিন্তু তারা যেন বেছে নিয়েছে সংকীর্ণ এক গলি। নিজেদের পথ নিয়ত কণ্টকাকীর্ণ করছে আর দোষ দিচ্ছে অন্যদের। জুলাইয়ের রাজনৈতিক চেতনা যে তরলায়িত রূপ পরিগ্রহ করেছে তার শিকড়ে রয়েছে নেতৃত্বের রাজনৈতিক অদক্ষতা এবং উদ্দেশ্যগত ভ্রান্তি।
গণ-অভ্যুত্থানের তরুণ নেতৃবৃন্দকে যাঁরা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ফিডআপ করতে চেয়েছেন তাঁদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং অবস্থানের মধ্যে ধারাবাহিকতা ছিল না। জুলাইকে বহুজন বহুভাবে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। এ কারণে জুলাইয়ের সর্বজনীন মানসিক পরিগঠন সম্ভব হয়নি। জুলাই ঘিরে একটি নতুন কথক শ্রেণির বিকাশ ঘটেছে। এ কথকদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শোনার জন্য তাদের অনুগামীরা অপেক্ষায় থাকেন। এমন কী এ কথক শ্রেণি পুরোনো বুদ্ধিজীবীদের সামাজিক উপযোগীতাও কমিয়ে দিয়েছে।
এদের অনেকে বিষয় বিশেষজ্ঞ না হয়েও প্রচুর জাজমেন্ট দিচ্ছেন, বিচার করছেন। সামাজিক মাধ্যম বিচার ব্যবস্হার সমান্তরাল হয়ে উঠার চেষ্টা করছে। এভাবে জুলাই ঘিরে পরিস্হিতি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে এক অযৌক্তিক কর্তৃত্বের বিকাশ দেখা যাচ্ছে। তাদের প্রভাব যথেষ্ট শক্তিশালীও বটে।
জুলাইয়ের একটি ভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন অধ্যাপক মোসতাক খানসহ অনেকে। তাঁরা মনে করেন, জুলাই এক নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটিয়েছে। এ শ্রেণি নেতৃত্বের অগ্রভাগে আসতে চায়। অন্যদিকে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে এক দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক তৈরি করেছে। ক্ষমতা ও রাজনীতির বহমান স্রোতে কান পাতলেই তার টের পাওয়া যায়। প্রাচীনপন্থীরা বিদ্যমান ব্যবস্থার পক্ষে এবং তরুণেরা পরিবর্তনের পক্ষে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো পরিবর্তনকামী তরুণেরা সমাজের সবচেয়ে অনড় শক্তির সঙ্গে পার্টনারশিপ গড়েছে।
৩০ বছর উন্নয়ন খাতে কাজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, পার্টনারশিপ তাঁদের সঙ্গে হয় যাঁদের সঙ্গে অভিন্ন কৌশলগত সাযুজ্য থাকে। অর্থাৎ গন্তব্য এক রকম না হলে পার্টনারশিপ হয় না। জোট বা ঐক্য হয় না। জামায়াতসহ ইসলামিক দলগুলোর সঙ্গে পার্টনারশিপের ভেতর এনসিপিরআদর্শিক ট্র্যাপ চোখে পড়ে।
অনেকের মনে সংশয় জাগে এনসিপি কি জামায়াতের বি-টিম হিসেবে কাজ করতে চায়। কারণ, বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতিতে বড় দলের অনুগামী ছোট ছোট দলের অস্তিত্ব লক্ষ করা যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এনসিপির এই অবস্থানের পেছনে বিশেষ শঙ্কা বা ভয় কাজ করে বলে মনে হয়, যা মূলত নিরাপত্তা ইস্যু। জামায়াতের সঙ্গে সখ্য এনসিপিকে যে নিরাপত্তা–সুরক্ষা দেবে, অন্যদের কাছ থেকে তা হয়তো পাওয়া সম্ভব নয়।
প্রারম্ভিক পর্যায়ে এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে আঁটসাঁট বেঁধেছে, এতে তাদের পক্ষে নিজ পায়ে দাঁড়ানো খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না। পুঁজিবাদী ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী এনসিপির সঙ্গে জোট বেঁধে যে কাজটি করছে তা হলো তরুণের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে বিকাশের সম্ভাবনা রুদ্ধ করে দিয়েছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- তরুণ প্রজন্ম
- জুলাই গণঅভ্যুত্থান