খেলাপি ঋণ কালচারের দায়ভার কি শুধুই ঋণগ্রহীতার
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘গত বছরের মার্চে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এটি ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ২ শতাংশে। আর চলতি বছরের মার্চে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৭ শতাংশে। খেলাপি ঋণের এ প্রবৃদ্ধি উদ্বেগজনক। খেলাপি ঋণের এ ঊর্ধ্বগতির জন্য ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ও কতিপয় বড় করপোরেট গ্রুপ দায়ী।’
প্রশ্ন হলো, খেলাপি ঋণ কালচারের দায়ভার কি শুধুই ঋণগ্রহীতার? গত বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশ ব্যাংক ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট প্রদানের মাধ্যমে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ দিয়েছিল। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ঋণগ্রহীতাদের অনেকেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়। বকেয়া ঋণের কিস্তি আদায়ের জন্য কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে ইচ্ছাকৃত ও পরীক্ষিত ঋণখেলাপিদের বারবার বিশেষ পুনঃতফসিলিকরণের সুবিধা দেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
পৃথিবীর সব দেশেই ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের সুবিধা দেওয়া হয়। তবে আমাদের দেশের মতো এত ঢালাওভাবে এ সুবিধা দেওয়া হয় না। একান্ত অনিবার্য কারণে কোনো ঋণগ্রহীতা ইচ্ছা ও চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও তার ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারলে তাকে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের সুবিধা দেওয়া হয়। এজন্য উন্নয়ন সহযোগীদের প্রণীত বিশেষ নিয়ম রয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই নিয়মের কোনো তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।
দেশের ব্যাংক খাতে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ আইনের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায় ১৯৯১ সালে। সেসময়, ২০ মে বাংলাদেশ ব্যাংক পত্রিকার মাধ্যমে ১৭১ জন বৃহৎ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করে। তালিকায় স্থানপ্রাপ্ত ঋণখেলাপিদের কাছে কমপক্ষে দেড় কোটি টাকা মেয়াদোত্তীর্ণ খেলাপি ঋণ পাওনা ছিল। এ তালিকা প্রকাশের পর ঋণখেলাপিদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, তারা নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ গ্রহণ করে। সেই সময় মোট তিনবার খেলাপি ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ করা যেত। প্রথমবার ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের জন্য মোট পাওনা খেলাপি ঋণের ১০ শতাংশ, দ্বিতীয়বার ২০ শতাংশ এবং তৃতীয়বার ৩০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট হিসাবে নগদে ব্যাংকে এককালীন জমা দিতে হতো।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে, ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাস দেশব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়। কলকারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়। সেসময় সরকারদলীয় সমর্থক একটি উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর চাপের মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক নামমাত্র ডাউন পেমেন্ট জমা নিয়ে ৫০০ কোটি টাকা ও তদূর্ধ্ব অঙ্কের খেলাপি ঋণ হিসাব পুনর্গঠন করিয়ে নেয়। পরবর্তীকালে আ হ ম মোস্তাফা কামাল অর্থমন্ত্রী থাকাকালে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ দেওয়া হয়। গত বছর অক্টোবরে এবং চলতি জুন কোয়ার্টারে আবারও ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ দেওয়া হয়। যারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং তারা চাইলে যে কোনো আইন পরিবর্তন করতে পারেন। বারবার ঋণখেলাপিদের এভাবে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার কারণে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তাহলে যারা নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নিয়মিত ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করে চলেছেন, তাদের কেন বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না? এভাবে ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা প্রদানের কারণে যারা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করে চলেছেন, তাদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হতে বাধ্য। ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ বিশেষ সুবিধার আওতায় যারা তাদের ঋণ হিসাব নিয়মিতকরণ করে নিয়েছেন, তাদের পরবর্তী ঋণের কিস্তি পরিশোধ কার্যক্রম সন্তোষজনক নয়। যারা ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ করিয়ে নিয়েছেন, তাদের অনেকেই শর্ত মোতাবেক ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করছেন না। ফলে যে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের মাধ্যমে খেলাপিমুক্ত করা হয়েছে, তা আবারও খেলাপি ঋণের খাতায় চলে যেতে পারে।